যৌবনকাল

122
যৌবনকাল 1

যৌবনকাল 2🖋কলমেঃ দীপ মুখোপাধ্যায়

(পর্ব -১৬)

যৌবনকাল 3

স্মৃতিকথনের বাঁক পালটানোটা যেন এক অনিবার্যতা।এই পাখসাট মারে ফের অন্য কথায় গতি নেয়। নিজের মুখটাকে তখন আয়নায় আদ্যন্ত মানুষের মুখ বলেই মনে হয়। যেখানে মুখোশের কোনও সওদাগরি নেই।নিজের মুখ বদল করার ইচ্ছেটা শুধুমাত্র সাজবদল। মুখোশ ধারণ নয়। তারা বাংলা চ্যানেলে আমার যোগদান চঞ্চলতা কে ফের নিবিড় এবং নিবিষ্ট করে তুলল। গুণগ্রাহী হয়ে উঠলাম বৈদ্যুতিন চ্যানেলের অধিক মাত্রিকতায়। কলা-কৈবল্যের সুক্ষ্মতায় মাত্রার ঠাসবুনুনি দিয়ে আমাকে বাংলাদেশকে যে তুলে ধরতে হবে।
এক মেদুর অতীত আমাকে টানতে থাকে।আমার শিকড়ও তো বরিশালের দেহেরগতি গ্রামে। খাদ্যাভাস থেকে আচার বিচার এখনও উপলব্ধি করি পারিবারিক পরম্পরার সামগ্রিকতায়। তবুও বিস্মৃত হইনা,আমি একজন উৎকেন্দ্রিক নাগরিক।টের পাই নিজের ব্যবহারিক অসম্পৃক্তিরও। লক্ষ্য করলাম বাংলাদেশের বন্ধুদের সঙ্গে জীবনচর্চার সান্নিধ্য বেশ উপভোগ্য। তারা বাংলা চ্যানেলের দৌলতে আলাপিত হলাম আয়ুব বাচ্চু,জেমস,চ্যানেল আই কর্তা সাগর ভাই কিংবা জাদুকর জুয়েল আইচের সঙ্গে।আমি,শ্যামলকান্তি আর প্রয়াত শিবায়ন ঘোষ ঢাকায় ছড়ার আসরে অবতীর্ণ হলাম আনন্দের অংশী হতে।তবে পরের বছর প্রথম ভারতীয় ছড়াকার হিসেবে দাওয়াত পাওয়াটা সত্যিই একটা ব্রেকিং নিউজ।লক্ষাধিক জনসমাগমে ছড়াপাঠ উল্লসিত হবার মতোই ঘটনা। কইলজায় তহুন তাজা অক্সিজেন ঢোকসে।ঢাকা থেকে প্রকাশিত ছড়াগ্রন্থ উৎসর্গ করেছি প্রিয় কবি আল মাহমুদকে। একটি রচনায় তিনি ভুলক্রমে আমায় বাংলাদেশের ছড়াকার বলে উল্লেখ করলেন।

সম্পদের প্রাচুর্য না ঢাললেও ছড়া আমাকে ঐক্যের ব্যপকতায় নতুন নতুন সম্পর্কে জড়িয়েছে
।এবার কোন হান দিয়া কী বিত্তান্তে যামু তা কী কওন যায়?
বাংলাদেশ আমাকে আমেজ দিয়েছে। বেসামাল করেছে। ইয়ার দোস্ত বাড়াইছে।মুরুব্বি-মহাজনদেরও দোয়া পাইছি। কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন আমায় ডলার ভাঙাতে দেননা। জোর করে পকেটে গুঁজে দেন টাকার গোছা। কলকাতার বেকার জীবনে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও এমন করতেন। আতিথ্যের ব্ল্যাঙ্ক চেক দিয়ে রেখেছেন চট্টগ্রামের নেছার আহমেদ কিংবা জনি প্রিন্ট কোম্পানির জাহির হোসেন।আদর করেছেন ভাষা সৈনিক আবদুল মতিন ভাই অবধি।কলকাতার খালাসীটোলায় যেমন শক্তিদার সঙ্গে কবিতা যাপন করেছি তেমনি সাকুরায় কবিতামনস্ক হয়েছি রফিক আজাদের সঙ্গসুখে। ঐকান্তিক ও হৃদয়বান সুহৃদ আমীরুল ইসলাম রসিকতা উগরে দিয়েছে,শিশুসাহিত্যের দায়বদ্ধতা থেকে, দীপুদা তোমাকে, আমি আজীবন প্রতিপালন করার ক্ষমতা রাখি।

দয়া কইরে আমার কথায় হাসপেন না। আমার গুণাবত্তার স্বীকৃতি পাইছিলাম টিএসসি চত্বরে কয়েকজন পোলাপান কবির আহ্লাদী জটলায়। একডা মাইয়া তো গদগদ ভঙ্গিতে আমার ছড়ার বাচিক নিবেদন শুরু করল। একজন পকেটমার ফাঁকতালে ওদের মধ্যে ভিড়ে গিয়েছিল।কিছুক্ষণের মধ্যে ঠাহর হলো,ক্রেডিটকার্ড সমেত মানিব্যাগ উধাও।উদভ্রান্ত অবস্থা লক্ষ্য করে তবক দেওয়া পানাসক্ত কবি আসাদ চৌধুরী ভালোবাসার বাস্তবতা উজাড় করে বলেছিলেন,খরচাপাতি আছে না?হেয়ার কী করবা?সোমোস্যা নাই। তোমারে চলমান থাকার জন্য কিছু টাকাকড়ি দিমু হ্যানে।

টাকাটা আমার নিতে হয়নি।কিন্তু এসব ভাবলেই আত্মবীক্ষণের আয়নাটা অসমতল হয়ে যায়।আদ্র হয়ে আসে চোখদুটো।মুগ্ধ হতে হয় আন্তরিকতার চমৎকারিত্বে।
এত কথার যে বাগবিস্তার,সেই সোনালী রঙের বিপরীতে যে কৃষ্ঞপ্রচ্ছায়া লুকিয়ে তারই বয়ান পেশ করে চলেছি। অবসাদ-বিষাদে অবগাহন করলেও আনন্দ আর উদ্দীপনার বলয়ে বারবার প্রবেশ করেছি পাকেচক্রে।এক অমোঘতন্ত্রের শরিক হয়েও বার্ধক্যের বেনারসিতে মগ্ন দুই বাংলার অপূর্ব মোহময় তৎসহ স্নেহময় পরিবেশে।

( চলবে)