যৌবনকাল

141
যৌবনকাল 1

যৌবনকাল 2🖊️কলমেঃ দীপ মুখোপাধ্যায়

( পর্ব–১৫)

যৌবনকাল 3

তহুন জেবনডা বেশ জুত লাগতে আছে। আকাঙ্খার গূঢ় প্রশ্রয়ে এটা যেন বিগত বিস্মৃত নিজেকে বর্তমান অস্তিত্বের কাছে ক্ষণিকের আত্মসমর্পণ ।জানি,ধ্রুবতার আশ্লেষ মাখানো হলেও কালতত্ব বড়ই কুটিল।কালের বর্জ্য কালই সাফ করে দেয়। এই আছে এই নেই।পানসে আবেষ্টনী ডিঙিয়ে পাঁচ তারা হোটেল আর অভিজাত ক্লাবে সন্ধে কাটাতে কাটাতে সাহিত্য থেকে প্রায় নির্বাসিত হলাম। তখন কত এমএলএ,এমপি আর মন্ত্রীর সঙ্গে গাল ঘষাঘষি।সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সন্ধিৎসা,দীপটা শেষমেষ মস্ত অফিসার বনে গেল।
সেই আহ্লাদি ও ঢলোঢলো চওড়া রাস্তায় অবাক লাগে নিজের সুটেড-বুটেড বদল দেখে। তবু সাহিত্য বিচ্ছেদের আভাস,অনুভবে গাঢ় হয়ে উঠলেও,পরিবর্তিত সত্তায় টুকটাক লেখালিখির স্বভাবটা স্বমূলে থেকে গিয়েছিল। সাহিত্য বিদায়ক্ষণের আক্ষেপ কাটিয়ে যে কারণে সানন্দা পত্রিকায় প্রচ্ছদ নিবন্ধ কিংবা বানিজ্যিক পত্রিকায় শিশুতোষ কবিতা লিখে অভ্যেসটা বজায় রাখছিলাম।কিঞ্চিৎ দর্শনায়িত বোধের সৃষ্টি হলেও হৃদয় কিন্তু আরাম পেতনা।আশির দশক আমাকে ভোগবাদের ব্যাপক আয়োজনে উন্নত জীবনমান ও অর্থনৈতিক থিতু করলেও কর্পোরেট ক্রীতদাসত্ব থেকে মুক্তি দেয়নি।

শুভ্রার বিশেষ তাগাদায় নব্বই সালের গোড়ায় বেরুল প্রথম ছড়াগ্রন্থ,”দীপ মুখোপাধ্যায়ের ছড়া”।সরকারি ক্রয় দাক্ষিণ্যে প্রথম বছরেই দশ হাজার কপি নিঃশেষিত। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় আনন্দবাজার পত্রিকায় রিভিউ লিখতে গিয়ে স্তুতিতে ভরিয়ে দিলেন।আমি খোঁজ পেলাম এক অলৌকিক মুক্তির। ধরাকে তখন ছড়া জ্ঞান করতে শুরু করেছি। ছড়াপাঠ করতে,(থুড়ি থুক্কি),মঞ্চ মাতাতে,তখন ছুটে যাচ্ছি গ্রামে গ্রামে।ছড়াকে ঝলসে তুলছি আগুনের ফুলকির মতো।ছড়াসঙ্গী কখনও শ্যামলকান্তি কখনও বা মৃদুল।অনেকেই উপদেশ দিলেন,শুধুমাত্র ছড়া লিখে কী হবে? আমি ভেবেছিলাম ছড়া যে নিয়মিত সমাজ-বাস্তবতাকে প্রকাশ করে। আনন্দ,দুঃখ কিংবা দ্রোহ প্রকাশে এটা একটা অনিবার্য মুখর মাধ্যম যা কল্পনা আর বাস্তবের শৈল্পিক মিশ্রণ। সুনির্বাচিত শব্দবিন্যাসে হৃদয়গ্রাহী। বিভিন্ন বানিজ্যিক পত্রিকায় আমার উজ্জ্বল উপস্থিতি জনপ্রিয়তা না দিলেও প্রিয় জনতা দিল।এর ভেতরেই মিলল শিশুসাহিত্য পরিষদ পদক,কিশোর ভারতী সম্মাননা ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বাংলা অাকাদেমী পদক।নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ও শঙ্খ ঘোষ আমার পিঠ চাপড়ে দিলেন।সেই থেকে আজতক আমি ছড়ার একজন নিরবচ্ছিন্ন সাপ্লায়ার। এই গুছোনো জীবন সবার কাছে অর্থবহ মনে হলেও আমার কাছে কাঙ্খিত ছিলনা। জানি,শত চেষ্টা করেও পুরনো জীবনে প্রস্থানের আর অধিকার পাবনা। ছেঁড়া শিকড় কী সহজে জোড়া লাগে?তবুও সময় আবার আমাকে সেই প্রস্থানের প্রত্যন্ত প্রান্তে নিয়ে যেতে চায়।

ইতিমধ্যে পিতৃদেব একটি মর্মান্তিক ট্রেন দুর্ঘটনায় গত হয়েছেন।আমার চোখে ছায়াচিত্রের মতো কত কিছু ভেসে ওঠে। কখনও জ্যোৎস্নার মতো নরম আর স্নিগ্ধ।ফের আধা চেনা বিষণ্নতামন্ডিত।নানা অনুষঙ্গের স্মৃতি খুঁড়তে খুঁড়তে অমোঘ বিমুগ্ধতায় অর্থহীন গহ্বরে ফের ঢুকে পড়ি।বর্তমানকে বেবাক তুচ্ছ করতে থাকি।বাড়ির স্টিয়ারিং তখন শুভ্রার হাতে ছেড়ে দেওয়া।
এর মধ্যেই একটা অকান্ড করে ফেললাম।যে চাকরিটা নির্ভাবনার অন্ন আর নিশ্চিন্তের ঘুম জুগিয়ে যাচ্ছিল সেখান থেকে বিনা কারণে ভোগের সীমারেখা ছিন্ন করে স্বেচ্ছাঅবসর। এর সামগ্রিক ব্যাপকতা আমাকে ফের ঠেলে দিল অনিশ্চিতের অন্ধকারে।
তবু ছড়াচর্চা চলমান ছিল। ছড়াকে থোড়-বড়ি-খাড়ার দৈনন্দিনতা থেকে মুক্ত করতে আবার ব্যস্ত হয়ে উঠলাম।ঔদরিক সমস্যা তখন সামান্য পেনশন ভাতা আর ও শুভ্রার স্কুলের বেতন দিয়ে সামাল দেওয়া যাচ্ছে। তবে এট্টু বুঝইয়া হুনইয়া চলন লাগে।ঠিক করে নিলাম,যেমুন চলতাছি চলমু।এহুনও জেবনের দধ পাই গো। বুঝতে পারি বয়সজনিত বহুদর্শিতা আমার অর্জিত প্রজ্ঞাকে ছিন্নভিন্ন করতে পারেনি।ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়েছে বা টুকরো হয়েছে সুস্থিতি।কিন্তু অন্তর্গত সত্তা তখনও প্রোথিত ছিল শাশ্বত ভাবেই।

চলবে…