Homeএখন খবরসঙ্গে রুকস্যাক।। মীর হাকিমুল আলি

সঙ্গে রুকস্যাক।। মীর হাকিমুল আলি

পাথরা ! অবহেলিত বাংলার আরেক বিষ্ণুপুর                                ️মীর হাকিমুল আলি

যাঁরা বিষ্ণুপুর গেছেন কিংবা যাঁরা বিষ্ণুপুর যাওয়ার কথা ভাবছেন তাঁদের একবার পাথরা যাওয়ার কথা বলব। যাঁরা অনেক আগে পাথরা দেখে এসেছেন তাঁদেরও বলব আরও একবার পাথরা ঘুরে আসুন। কাঁসাইয়ের বাঁক ছোঁয়া উত্তরের পাথরা এখন অনেক খানি বদলে গেছে। পশ্চিম মেদিনীপুরের এক অখ্যাত গ্রাম পাথরা । যাকে অনেকেই বলি মন্দিরময় পাথরা, কারণ এই গ্রামে যত্র তত্র ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য প্রাচীন মন্দির। আগে রাস্তাঘাট খুব খারাপ ছিল। কিন্তু এখন পাথরা যাওয়ার রাস্তা যথেষ্ট ভালো, সুন্দর ও সুগম্য। কাঁসাই নদীর তীরে সুন্দর সবুজ এই পাথরা গত ৫০বছর ধরে লড়ে যাওয়া কবির পুরস্কারে সম্মানিত ইয়াসিন পাঠানের এখন অনেকটাই আলোকিত পর্যটনের দরবারে যদিও বলতে দ্বিধা নেই বাজারের বিপণনের অভাবে এখনও মহার্ঘ্য পর্যটকের পা পড়েনা এখানে।

শুরুতেই একটু পাথরার ইতিহাস জেনে নেওয়া যাক। কাঁসাই নদী যার প্রাচীন নাম ‘কপিশা ‘ তার তীরেই রতনচক বা পাথরা গ্রাম। আগে এর নাম ছিল দেবগ্রাম। এটি একটি পাঁচশো বছরের জনপদ। বিদ্যানন্দ ঘোষালের হাতির পা থেকে বেঁচে যাওয়া অর্থাৎ পা -উৎরা থেকে কালক্রমে অপভ্ৰংশ রূপ পাথরা হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেন কাঁসাই নদীর তীর ছিল পাথরে পরিপূর্ণ তাই এই স্থানের নাম পাথরা। পাথরা খুবই প্রাচীন গ্রাম। আগে গ্রাম একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল। তাম্রলিপ্ত বন্দরের পশ্চাদভূমির অন্তর্গত ছিল এই পাথরা। উত্তর ভারত থেকে পরিব্রাজকরা বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান -বিষ্ণুপুর -গড়বেতা -চন্দ্রকোনা -মেদিনীপুর হয়ে পাথরা আসতেন। তারপর কাঁসাই নদী ধরে রূপনারায়ণ নদে গিয়ে মিশতেন আর তাম্রলিপ্ত বা তমলুক পৌছাতেন। তারপর সেখান থেকে পুরী যেতেন। পাথরা ছিল হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন বহু তীর্থ যাত্রীদের বিশ্রামের এক প্রসিদ্ধ স্থান। তাই এখানে গড়ে তোলা হয়েছিল বিশ্রামাগার ও উপাসনা গৃহ। বাংলা -বিহার -উড়িষ্যার নবাব আলীবর্দী খাঁ বিদ্যানন্দ ঘোষালকে 1732 সালে রতনচক পরগনার খাজনা আদায়ের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি দিন দিন সেই খাজনার অর্থে ধনী হতে থাকেন এবং পাথরায় বহু মন্দির স্থাপন করতে থাকেন। আলীবর্দী খাঁ খবর পান যে বিদ্যানন্দ ঘোষাল রাজস্ব আদায়ের টাকা হিন্দু মন্দির নির্মাণ করে ব্যয় করছেন। নবাব রেগে তাঁকে পদচ্যুত করে বন্দি করেন এবং হাতির পায়ে পিষে মারার নির্দেশ দেন। কিন্তু মৃত্যুদন্ডের দিন পাগলা হাতি তাঁকে কিছুতেই পা দিয়ে পিষলোনা, মাহুতের শত চেষ্টা ব্যর্থ করে নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইলো l তা দেখে নবাব বিদ্যানন্দের সততার পরিষ্কার পরিচয় পেয়ে তাঁকে মুক্ত করে দিলেন ও রতনচকের জমিদারি পুনরায় ফিরিয়ে দেন।তারপর থেকে বিদ্যানন্দ নতুন উদ্যমে আবার মন্দির নির্মাণ শুরু করেন। পরবর্তী কালে বিদ্যানন্দ ঘোষালের পরিবার থেকে মজুমদার ও বন্দ্যোপাধ্যায় প্রভৃতি পরিবারের সৃষ্টি হয় । তারা শহরে চলে যাওয়ার পর পাথরা তার গুরুত্ব হারিয়ে বনজঙ্গলে ঢাকা পড়ে যায়।

মন্দিরের_বর্ণনা : পাথরায় বহু মন্দির ছিল এখন 34 টি মন্দিরের 28 টি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ।বহু মন্দির কাঁসাই নদীর গর্ভে তলিয়ে গেছে । কাঁসাই নদীর প্লাবনের ফলে পলি জমে পুরো অঞ্চলটা ভরাট হয়ে যায়। নদীর তীরের মন্দিরগুলো সেই পলি তুলে বের করা হয়েছে তাই কয়েকটা মন্দিরের বেদী মাটির নীচে রয়েছে। এখনও কয়েকটা মন্দির এর ধ্বংসাবশেষ মাটির নীচে প্রোথিত। এখানে আছে – নাটমন্দির কাছারিবাড়ি রাসমঞ্চ ঠাকুরদালান নহবতখানা শিব মন্দির শীতলা মন্দির দুর্গামন্দির নদী তীরে রাস্তার দক্ষিণ দিকে পঞ্চরত্ন মন্দির।এটি পাথরা ঢুকতে একেবারে প্রথমে পড়ে, একা বিচ্ছিন্ন একটি মন্দির।তবে এটিতে পূজা হয়ে থাকে।দরজায় তালা ঝোলানো। আর কিছুটা দূরে রাস্তা ধরে গেলেই ডান দিকে আর বাম দিকে বেশ অনেকগুলি মন্দির আছে।একটা মাঠ এর মতো আছে।রাস্তার ডান দিকে আছে একটি নবরত্ন মন্দির মন্দির।দারুন এর গঠন শৈলী। সামনে থাম দেওয়া।সেগুলি খুব নকশা করা।টেরাকোটার কাজ লক্ষ্যনীয়।

তবে এই মন্দিরে পুজো হয়না।এই মন্দিরটি মা ও ছেলের বিবাদে অভিষেক থেকেই বজ্রাঘাতে অভিশপ্ত তাই কোন দিনই পূজা হয়নি।মন্দির সংলগ্ন কয়েকটি কক্ষ আছে।সম্ভবত এখানে পুরোহিতরা থাকতেন ।রাস্তার একেবারে ধারে আছে একটি ছোট্ট রাসমঞ্চ বা প্রদীপ মঞ্চ।রাস্তার বাম দিকে আছে নাটমন্দির, পঞ্চরত্ন শিব মন্দির, সারি দেওয়া তিনটি এক রত্ন শিব মন্দির। এছাড়া আরও কয়েকটি শিব মন্দির দূরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অবস্থান করছে কিন্তু কোনোটাতেই বিগ্রহ নেই। একটি দূর্গা মন্দির বা মণ্ডপ একটু দূরেই।পাথরের তৈরী এটি ভগ্নপ্রায়। তবে এখানে প্রত্যেক বছর ধুমধাম করে দুর্গাপূজা হয়। দুর্গামণ্ডপের পাশেই আছে এক অট্টালিকার ভগ্নাবশেষ।এর উঁচু অংশে এখনও ওঠা যায়,সিঁড়ি আছে। গ্রামের ভেতরের দিকে একটু এগিয়ে গেলেই আর একটি মন্দির আছে।যেটি কালাচাঁদ মন্দির নামে খ্যাত।আরও এদিকে সেদিকে তিনটি শীতলা মন্দির আছে ।গ্রামের আরও ভেতর দিকে মজুমদারদের তিনটি পঞ্চরত্ন শিব মন্দির আছে পর পর। এখানে নিয়মিত পূজা হয়ে থাকে। শিব লিঙ্গ আছে।তিনটি মন্দির তিনটি সময়কে তুলে ধরে।মন্দিরের দ্বারপালের কেউ লাঠি, কেউ তলোয়ার, তো কেউ বন্দুকধারী। টেরাকোটার কারূকার্যে সমৃদ্ধ মন্দিরগুলি।বিষ্ণুর দশ অবতার, জৈন মূর্তি, তিনটি মন্দিরে 7টি শিবের বিগ্রহ আছে। অনতিদূরে দেখা যায় ভগ্ন দোতলা অট্টালিকা।এটি ছিল কাছারি বাড়ি।বেশ লম্বা।বাইরে খুব সুন্দর স্তম্ভ বিশিষ্ট প্রাচীর।তাতে কারুকার্য করা।এই কাছারিবাড়িতে যেমন আছে সুড়ঙ্গ, তেমন আছে গোপন কক্ষ, গুপ্তপথ আছে, সিঁড়ি বেয়ে ঘুরে ঘুরে ওপরে ওঠা যায়। কিন্তু কোন ছাদ নেই।দেওয়ালে আছে কুলুঙ্গি।পুরো বাড়িটি রহস্যে পরিপূর্ণ।গারদঘরে অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া হতো।এই কাছারিবাড়ির সামনে পেছনে রয়েছে কয়েকটি শিব মন্দির। শিবলিঙ্গ আছে।পাশেই আছে এক অপূর্ব সুন্দর রাসমঞ্চ।এটি 2000 সালে হেরিটেজ মর্যাদা পায়। রাসপূর্ণিমার সময় রাস উৎসব হতো ।জমিদারের পিতলের নয়চূড়া রথ এখান থেকে টেনে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হতো।আবার এখানে ফিরে আসতো।

মন্দিরের_গঠনশৈলী_ও_শিল্পরীতি : পাথরার মন্দিরগুলি বেশিরভাগ সপ্তদশ -অষ্টাদশ শতকে নির্মিত। এগুলি বেশিরভাগ বহু চূড়া বিশিষ্ট। কোনোটাই চারচালা ধরণের। মন্দিরগুলি চুন সুরকি, পোড়া ইট, মাটি, ইত্যাদি দিয়ে তৈরী । টেরাকোটা এখানকার মন্দিরের আর এক বৈশিষ্ট্য।কোথাও একরত্ন, পঞ্চরত্ন আবার কোথাও নবরত্ন ধরণের।কোন মন্দিরের গায়ে দশ অবতার, কোনোটির গায়ে নর্তক নর্তকীর অবয়ব।কোনোটিতে আছে হলধারী বলরামের মূর্তি ।মন্দিরের গায়ে, দরজার দুই ধারে, ওপরে খুব সুন্দর নকশা করা ।পোড়ামাটি দিয়ে ফুল আঁকা, বিভিন্ন অবতার আঁকা। কাছারিবাড়ির দালান, থাম, ও নাটমঞ্চের, রাসমঞ্চের থামগুলো অপূর্ব নকশা করা ও কারুকার্যময়।

কিভাবে যাবেন : খড়্গপুর স্টেশন/বাস স্ট্যান্ড থেকে পাথরা 15কিমি ।মেদিনীপুর স্টেশন/ বাস স্ট্যান্ড থেকে পাথরা 13 কিমি। এই দুই স্টেশন থেকে বাসে করে আমতলা আসতে হবে। সেখান থেকে 8. 5 কিমি অটো করে যেতে হবে। নিজস্ব গাড়িতে বা গাড়ি ভাড়া করেও যেতে পারেন। #কখন যাবেন? : বছরের যেকোনো সময় যেতে পারেন। তবে শরৎ, শীত কালে গেলে বেশি ভালো।শরতে কাশ ফুলের বাহার কাঁসাই এর তীর জুড়ে। শীতের সময় বিভিন্ন সবজি আর ফুলে মাঠ ভরে থাকে। থাকা খাওয়ার সেরকম কোন ব্যবস্থা নেই। মেদিনীপুর শহরে এসব সুবিধা আছে। যাঁরা ইতিহাস আর ভ্রমন একসাথে ভালবাসেন তাঁদের জন্য পাথরা একটি আদর্শ জায়গা।

RELATED ARTICLES

Most Popular