সুবর্নরেখার কথা -১২ ।। উপেন পাত্র

299
সুবর্নরেখার কথা -১২ ।। উপেন পাত্র 1

সুবর্ণরেখা অববাহিকার অবলুপ্ত লোকক্রীড়া                                            উপেন পাত্র

অতীতে সুবর্ণরেখা নদী অববাহিকা বহু লোকক্রীড়া প্রচলিত ছিল,যেগুলি সবই লুপ্ত হয়ে গেছে।নানা প্রকার আউটডোর বা খোলা মাঠে খেলা এবং ইনডোর বা ঘরে বসে খেলা ছিল।খোলা মাঠে খেলার মধ্যে জনপ্রিয় ছিল– দাঁড়িয়াবাঁধা,হা-ডুডু,ডাং-গুলি, সীতাহরণ, ওড়গড়,মার্বেল গুটি, গাছ বাগড়ি,ছেলকা, এক্কাদোক্কা ও গাতি খেলা এবং ঘরে বসে খেলার মধ্যে জনপ্রিয় ছিল-পাশা খেলা, বাঘ- বন্দী, সাত গুটিকা, রম্ভাবালি ও কড়িখেলা।

সাধারণত বড় ছেলেরা দাঁড়িয়াবাঁধা ও হা-ডুডু খেলতো আর ছোট ছেলেরা অন্য খেলাগুলি খেলতো।ঘরে বসে খেলাগুলি ছেলে ও মেয়ে উভয়ের কাছে জনপ্রিয় ছিল,তবে এক্কাদোক্কা ও কড়ি খেলা শুধু মেয়েরা খেলতো।সীতাহরণ খেলাটি ছোট ছেলে ও মেয়ে উভয়ের কাছেই জনপ্রিয় ছিল,তবে ছেলেরা ও মেয়েরা আলাদা ভাবে খেলতো।গাছ বাগড়ি ও রম্ভাবালি খেলা আমাদের ছোটবেলায় লুপ্ত হয়ে গেছে।বয়স্কদের মুখে এই দুটি খেলার শুধু বর্ণনা শুনেছি।আমাদের ছোটবেলা থেকে ফুটবল ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, কিন্তু ক্রিকেটের নামটাও আমরা শুনিনি। এখন তো দেখি ক্রিকেটই একমাত্র খেলা হয়েছে।

আরও পড়ুন -  করোনা সংক্রমণ এড়াতে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নয়া নির্দেশিকা রাজ্যের

দাঁড়িয়াবাঁধা খেলা ছক কেটে খেলা হতো,এই খেলাটি দুর্গ রক্ষার এক অনুকরণ ছিল।হা-ডুডু খেলাটি দম ধরে রাখার খেলা ছিল।ডাং-গুলি খেলায় একটি লাঠি(ডাং) ও একটি দুই মুখ ছুঁচালো গুলি ব্যবহার করা হতো।সীতাহরণ ও অড়গড় হা-ডুডুর মতো দম ধরে রাখার খেলা ছিল। ছেলকা হলো শরকাঠি,ওটি ছুঁড়ে কে কত দুরে ফেলতে পারে তার প্রতিযোগিতা।মার্বেল গুটি খেলায় দুর থেকে একটা গর্তের মধ্যে মার্বেল গুটি ফেলতে হতো।গাতি খেলায় গাতি বা চ্যাপ্টা পাথর দুরে গর্তের মধ্যে ফেলতে হতো।সাতগুটিকা খেলায় দুই সারিতে সাতটি করে চৌদ্দটি ঘর থাকতো,খেজুর বীজকে গুটি রূপে ব্যবহার করা হতো।

আরও পড়ুন -  অত্যন্ত সংকটজনক শারীরিক অবস্থা, ভেন্টিলেশনে বর্ষীয়ান অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

বাঘবন্দী খেলায় সিমেন্টের মেঝেতে স্থায়ী ঘর কাটা থাকতো কিংবা তাৎক্ষণিক ভাবে কুঁদরি পাতা ঘসে ঘর কাটা হতো।
ছোট মেয়েরা এক্কাদোক্কা খেলতো।বড় মেয়েরা দুপুরের অবসরে কড়ি খেলতো। উপর থেকে ঝনাৎ করে কড়ি ফেলা হতো।কড়ির চিত বা উপুড় অনুযায়ী পয়েন্ট হিসাব করা হতো।পাশা খেলা ছিল বৃদ্ধদের অবসর বিনোদন।পাশা খেলায় লুডোর মতো ছক থাকতো , কিন্তু তা কাপড় দিয়ে তৈরী বড় আকারের ছিল, যার মধ্যে রঙীন কাপড়ের টুকরো সেলাই করা থাকতো।কাঠের টুকরো দিয়ে গুটি বানানো হতো এবং হাড়ের তৈরী লম্বাটে গুটিতে ফুটকি চিহ্নিত সংখ্যা থাকতো।ঐ গুটিতে দান ফেলার সময় চিৎকার করে দান বলা হতো,যা দুর থেকেও শোনা যেতো।

সীতাহরণ খেলায় দম রাখার কালে কিছু ছড়া বলা হতো,যেগুলি খুব চিত্তাকর্ষক।এই খেলায় খেলোয়াড়েরা দুই দলে সমান সংখ্যক ভাগ হয়ে যেতো।একদল একটা ঘরের মধ্যে থাকতো এবং ঐ ঘর থেকে প্রায় ১০০ মিটার দুরে তাদের পক্ষে সীতা বসানো হতো।অপর দল সীতার চারপাশে ছড়িয়ে থাকতো,তাদেরকে বিপক্ষ দলের এক একজন করে ছড়া বলতে বলতে তাড়া করে ছুঁয়ে ফেললে মোর হতো।কিন্তু দম ছেড়ে দেওয়া অবস্থায় বিপক্ষের কেউ ছুঁয়ে দিলে সে নিজেই মোর হতো।ফাঁক বুঝে সীতা পালিয়ে এসে ঘরে ঢুকে যেতে পারলে জিত হতো।কিন্তু সীতাকে কেউ ছুঁয়ে দিতে পারলে হার হতো।সীতাহরণ খেলার কয়েকটি ছড়া নিম্নরূপ–

আরও পড়ুন -  তামিলনাড়ুতে পরীক্ষা ছাড়াই উত্তীর্ণ করা হবে দশম-একাদশ শ্রেনীর পড়ুয়াদের,সরকারের সমালোচনায় দেশবাসী

১। ছেল কিত কিত নাড়িয়া
পাগড়ি বাঁধা দাঢ়িয়া।
২। জ্বললা নিয়া উঠলা ধুঁয়া
আয়রে মড়া গুজিয়া মুহাঁ।
৩। কদুল পতর নেহনেহকা
বাঁশ পতর সরু।
বাজা মারি পূজা দিমু
তোর বড় খেলুটি মরু।
৪। হা-ডুডু খেলতে গেনু
কুঢ়েই পাইনু বেল।
বেলের ভিতর লেখা আছে
হা-ডুডুর খেল।

সুবর্নরেখার কথা -১২ ।। উপেন পাত্র 2