সুবর্নরেখার কথা -১০ উপেন পাত্র

213

সুবর্ণরেখা অববাহিকার পার্বন ও লোকাচার
                          উপেন পাত্র                                                      আবহমান কাল ধরে পালিত লোকাচারগুলি প্রধানত কৃষি ও পশুপালন ভিত্তিক আর কিছু পূর্ব পুরুষের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা নিবেদন।লোকাচারে ১লা মাঘ থেকে কৃষি বর্ষের সূচনা ধরা হয়।এইদিন আনুষ্ঠানিক ভাবে জমিতে হল কর্ষণ শুরু হয়।হলুদ জলে গোরুর পা ধুইয়ে, শিঙে তেল মাখিয়ে, নতুন দড়িতে জোয়াল জুতে জমিতে আড়াই ফেরতা লাঙলা চালাতে হয়।একে হালচার বলা হয়।
১লা মাঘ থেকে সারা মাস জুড়ে এ গাঁয়ে ও গাঁয়ে মকর মেলা চলে।এই মাসে গোবর গর্ত থেকে সারা বছরের গোবর কেটে শুকনো করে জমিতে ছড়ানো হয়।

চৈত্র মাসের সংক্রান্তিতে নুয়াহাঁড়ি বা মাটির হাঁড়ি পালটে নতুন হাঁড়িতে ভাত রান্না করার লোকাচার।বছরে দু’বার এই অনুষ্ঠান হয়,চৈত্র সংক্রান্তি ও দেওয়ালিতে। বাড়ির ঈশান কোনে ভাতের হাঁড়ি রাখার জন্য ঈশান বেদী থাকে। ঐ দিন ঈশান বেদী লেপাপোঁছা করে নতুন হাঁড়িতে ঘি মাখিয়ে তার মধ্যে একমুঠো আতপ চাল ও তুলসীপাতা রেখে শাঁখ বাজিয়ে হাঁড়িতে জল ঢালা হতো।
সারা বৈশাখ মাস জুড়ে তুলসী মঞ্চের ওপর মাটির ভাঁড়ে জল রেখে ফোঁটায় ফোঁটায় জল পড়ার ব্যবস্থা করা হতো। জৈষ্ঠ্য মাসের ১৩ থেকে ১৯ তারিখ পর্যন্ত লোকাচারে রোহিনী যোগ মানা হতো।ঐ সময়ে আউশ ধান বোনা হতো।আমন ধান দুই ভাবে চাষ হতো,রোয়া ও বোনা।রোয়া ধানের জন্য বীজতলা হয়,এছাড়া এই যোগে কিছু বোনাও হয়।জৈষ্ঠ্য মাসের সংক্রান্তিতে আষাঢ়ী পূজা বা ধরিত্রী পূজা হয়।এই পূজায় ধরিত্রী মাতাকে ঋতুমতী ও শস্যবতী হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

আষাঢ় মাসের প্রথম সপ্তাহে অম্বুবাচী,যা ধরিত্রী মাতার ঋতুকাল মান্য করা হতো।ঐকালে কৃষিকাজ বন্ধ থাকে,কোন কৃষি যন্ত্রপাতি মাটিতে ছোঁয়ানো নিষেধ থাকে।ধানকে ধরিত্রী কন্যা মনে করা হতো।কারণ কন্যা সন্তান যেমন পিতৃগৃহে জন্মে স্বামী গৃহে স্থায়ী হয়,ধান তেমন বীজতলায় জন্মে অন্য ক্ষেত্রে স্থায়ী হয়।তাই লোকাচারে ধানের বিবাহ ও সাধভক্ষণ পালিত হয়।
শ্রাবণ মাসের অমাবস্যা তিথিতে চিতো বা ঢেরা পরব পালিত হয়।ঐদিন কিছুক্ষেত্রে অরন্ধন পালিত হয়।বিকালে চিতো বা আসকে পিঠে বানিয়ে প্রথম পিঠাটিকে তিন টুকরো করে জল,মাটি ও আকাশের জীবদের উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়।তারপর গরম দুধে গুড় গুলে পিঠা ডুবিয়ে খাওয়া হয়।
শ্রাবণ মাসের রাখী পুর্ণিমাতে গমা পরব, ধান্যকন্যার বিবাহ।এদিন কন্যা জামাতাকে আমন্ত্রণ করে নববস্ত্র দেওয়া হতো।এদিন রাখী পরানোর সাথে পৈতাধারণ প্রথাও আছে।আচার্য শ্যামানন্দ জাতপাতহীন সমাজ গড়ার লক্ষ্যে এটির প্রচলন করেন।

আরও পড়ুন -  জেলার দীর্ঘতম কন্টেনমেন্ট জোন মেদিনীপুর শহরে! ঠেকে ঠেকে গুজব, রাজনৈতিক তরজায় বিজেপি তৃনমূল

ভাদ্র মাসের শুক্লা দ্বাদশী থেকে পূর্ণিমা পর্যন্ত ইঁদ পরবে ইন্দ্রধ্বজা তোলা হয়।পরবর্তী কৃষ্ণা অষ্টমীতে জিতুয়া পরব বা জীমূতবাহন ব্রত।তারপর আশ্বিন মাসের কোজাগরী পূর্ণিমাতে অব্যুঢ় ব্রত,যা অবিবাহিতদের পালন করতে হতো।
আশ্বিন সংক্রান্তি বা ডাক সংক্রান্তিতে ধানের সাধভক্ষণ।এদিন ধানখেতে শরকাঠি,যজ্ঞডুমুর শালের সাথে ভেষজ ওষুধ বেঁধে কতক ছড়া বলে খেত প্রদক্ষিণ করে ঐ ডাল পুঁতে দেওয়া হতো।

আরও পড়ুন -  আবারও ট্রেনের ধাক্কায় এক গর্ভবর্তী হস্তিনী সহ দুই হাতির মৃত্যু

এরপর দেওয়ালি থেকে ভাইফোঁটা পর্যন্ত বাঁদনা ও পৈড়ান পরব।বাঁদনাতে কৃষিবাহন গো বন্দনা প্রচলিত থাকলেও পৈড়ান লুপ্ত হয়ে গেছে।দেওয়ালির ভোরে মানুষ,গবাদি পশু ও ফসলের ক্ষতিকর কীটপতঙ্গকে তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য “মশাখেদা” লোকাচারও ছিল।
রাসপূর্ণিমা পরবর্তী অষ্টমী তিথিতে প্রথমা বা পঢ়ুঁয়া অষ্টমী পালিত হয়।প্রথম জাত সন্তানের, পুত্র বা কন্যা যাই হোক,জন্মদিন পালনের মতো এই অনুষ্ঠান পালিত হয়।অগ্রহায়ণ মাসেই হয় নবান্ন। নতুন ধানের ভাত, চিড়ে ও নতুন চালগুঁড়ি দিয়ে পিঠা দিয়ে নবান্ন পালিত হয়।
অগ্রহায়ণ সংক্রান্তিতে ছোট মকর পালিত হয়।এইদিন থেকে পৌষ পার্বণের প্রস্তুতি চলে।টুসুর গান,ছো-চাং-কাঠিনাচের মহড়া চলতে থাকে।মকর সংক্রান্তিতে ভোরে উঠে মকর স্নান সেরে খামার পূজা হয়।তারপর সারাদিন শুধু পিঠা খাওয়া আর নানা আমোদ প্রমোদ চলে।এইভাবে কৃষিবর্ষ শেষ হয়।

সুবর্নরেখার কথা -১০  উপেন পাত্র 1