স্কুল খুললেই পড়া ধরব! পড়ুয়াদের বাড়িতে বাড়িতে হোম টাস্ক নিয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক

240
Advertisement

সুদীপ খাঁড়া :দেশ জুড়ে চলছে লকডাউন। এক নাগাড়ে বিদ্যালয় বন্ধ দীর্ঘ দিন। কচি-কাঁচা থেকে শুরু করে বয়স্ক – বাইরে বেরোতে মানা সকলেরই। দীর্ঘ দিন ঘরের মধ্যে থেকে গ্রাস করতে পারে হতাশা। এসব তো গেল তত্ব কথা। বাস্তবে প্রয়োজনে কিছু মানুষ বাইরে বেরোচ্ছেন। বড়লোক থেকে শুরু করে নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের হাতেই রয়েছে টিভি – সোশ্যাল মিডিয়ার মতো অবসর যাপনের নানান উপকরণ। গ্রামের প্রান্তিক মানুষজন কষ্টে দিন কাটালেও খোলা হাওয়াটা পাচ্ছে প্রকৃতির বদান্যতায়।

Advertisement

এসবের মাঝেই চরম অবহেলিত এক শ্রেণীর ছাত্র-ছাত্রীদের পঠন-পাঠন। শহরাঞ্চলের স্কুল গুলির অভিভাবক সচেতন, নিয়মিত যোগাযোগের সুযোগ রয়েছে বিদ্যালয় শিক্ষক বা প্রাইভেট টিউটরদের সঙ্গে। কিন্তু গ্রামাঞ্চলে নিম্নবিত্ত প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়াদের সামনে চরম সংকট।
সরকার নিজস্ব ওয়েবসাইটে বাড়িতে থেকে পড়াশোনার জন্য নানান চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেই প্রচেষ্টার সুফল পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব এই প্রান্তিক পরিবারের ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে।
এই পরিস্থিতিতে ছাত্র-ছাত্রীদের পাশে এসে দাঁড়ালেন মেদিনীপুর সদর ব্লকের তলকুই উচ্চ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক অরিন্দম দাস। সরকার কর্তৃক প্রকাশিত হোমওয়ার্ক হোয়াটস অ্যাপের মাধ্যমে ছাত্র ছাত্রীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

Advertisement
Advertisement

কিন্তু অরিন্দম বাবু বলেন তাঁর বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের অধিকাংশের বাড়িতে স্মার্ট ফোন তো দুরের কথা সাধারণ ফোনই নেই। তাই তাদের কাছে এই পরিষেবা বাড়িতে থেকে পৌঁছে দেওয়া কোন ভাবেই সম্ভব নয়। তাই তিনি নিজে বাড়িতে ওই প্রশ্নপত্রগুলি ছাত্র সংখ্যার অনুপাতে প্রিন্ট করে সেগুলিকে তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেন। অরিন্দম বাবুর সাথে কথা বলে জানা যায় তিনি এই এলাকারই মানুষ। এখানেই তিনি বড়ো হয়েছেন। তাই নিজের গ্রাম এবং পাশাপাশি গ্রামের সমস্ত বিষয়ই তার নখদর্পনে। তিনি বলেন শহর লাগোয়া এই গ্রামের উচ্চ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ুয়ারা মূলত হত দরিদ্র পরিবার থেকে আসে। এলাকার মানুষ হওয়ায় এই পরিবারগুলির ভালো মন্দের দায়িত্বও এসে পড়ে নিজের উপর। তাই এই সময় পরিবার গুলির তথা তাঁর প্রাণ প্রিয় ছাত্রছাত্রীদের জন্য তিনি বেশ চিন্তিতও ছিলেন।

এসব কথা ভেবেই নিজের স্ত্রী পায়েল পাল(দাশ) কে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন পাশের গ্রামগুলিতে। প্রিয় শিক্ষককে গ্রামে ঢুকতে দেখেই এক ছুটে সামনে এসে দাঁড়ায় একে একে করে রাহুল, বৃষ্টি, মামনীরা। অনেকদিন পর ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে পেয়ে মন ভরে যায় শিক্ষক মশায়ের। তবে সরকারি বিধি নিষেধ মেনে সবাইকে দুরে দুরে দাঁড় করিয়েই কুশল বিনিময় করেন প্রধান শিক্ষক। প্রথমে আরও একবার সচেতনতার কথা মনে করিয়ে দেন ছাত্র ছাত্রীদের। তারপর পড়াশোনার কথা, পারিবারিক কিছু গল্প। তবে সবই চলে দুরে দুরে দাঁড়িয়েই। এরপর তিনি সরকার নির্দেশিত হোমওয়ার্ক,একটি খাতা দিয়ে তাদের বুঝিয়ে বলেন কিভাবে উত্তর লিখে তা যত্ন করে রাখতে হবে নিজের কাছে। তিনি জানেন ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা বাইরে যাওয়ার জন্য ছটফট করবেই। তাই তাদের বাড়িতে কিছু সময় আটকে রাখার জন্য তিনি সঙ্গে নিয়ে যান ড্রয়িং খাতা এবং রঙ পেন্সিল। সেগুলি তাদের হাতে তুলে দিয়ে বলেন স্কুল খুললে যেন দেখি সব পৃষ্ঠায় ছবি আঁকা রয়েছে।

কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গেও কথা বলেন অরিন্দম বাবু। মূলত সরকারি সাহায্য ঠিকঠাক পাওয়া যাচ্ছে কি না সেই বিষয়ে খোঁজ নেন তিনি। তাছাড়াও ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তিদের জন্য নতুন চালু হওয়া পেনশন স্কিমের বিষয়েও কয়েকজনকে অবগত করিয়ে সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিকের অফিসে যোগাযোগ করতে বলেন।
অরিন্দম বাবু জানান, “এলাকার মানুষ হওয়ায় এই সমস্ত মানুষের সুখ দুঃখের সঙ্গী হওয়াটা আমার কর্তব্যের মধ্যে পড়ে বলেই আমি মনে করি। আর ছাত্র-ছাত্রীরা তো আমার বেঁচে থাকার অক্সিজেন। অক্সিজেন ছাড়া মানুষ বাঁচে নাকি!”