জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল– ৪৫

1092
Advertisement

জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল– ৪৫
রাধাবিনোদ মন্দির, পাঁচরোল (এগরা- ১)
চিন্ময় দাশ

Advertisement

Advertisement
Advertisement

একদিকে দেবারাধনা, অন্যদিকে জীবন বাজি রেখে বিদেশী শাসনের বিরোধিতা– এই দুই উপাদানে গড়ে উঠেছিল পাঁচরোল গ্রামের খ্যাতি। যার হোতা এক জমিদার পরিবার।
একেবারে আদিতে, এই জমিদারবংশ ছিল রাজপুতানার অধিবাসী। আলাউদ্দিন খিলজীর একের পর এক গুজরাট, রণথম্ভোর, মেবার, মালব ইত্যাদি রাজ্যগ্রাস এবং সেই সাথে নির্বিচার লুন্ঠন, নরহত্যা আর ধর্মান্তরকরণ বিভীষিকা সৃষ্টি করেছিল পশ্চিম ভারতে। সেসময় জীবন এবং স্বধর্ম বাঁচানোর তাগিদে বহু রাজবংশ তীর্থদর্শনের নামে দেশত্যাগী হয়ে পড়েছিলেন।
যাঁরা পূর্ব ভারতে জগন্নাথধাম পুরী পৌঁ

ছেছিলেন, তাঁদের অনেকেই সেই এলাকায় থেকে গিয়েছিলেন। পূর্ব পরিচয় ত্যাগ করে, স্থানীয় পদবি এবং ‘রাজু’ জাতি পরিচয় গ্রহণ করেন তাঁরা। তাঁদেরই একটি শাখার বাস ছিল পুরী জেলার কাঁশবাঁশ এলাকায়। জনৈক নারায়ণ ‘দাস মহাপাত্র’ ভাগ্যান্বেষণে কাঁশবাঁশ থেকে মেদিনীপুর জেলায় চলে আসেন। জেলার দক্ষিণ এলাকায় শীপুর পরগণার পাঁচরোল গ্রামটি পছন্দ করে, সেখানেই থিতু হন।

জীবিকা হিসাবে নারায়ণ বেছে নিয়েছিলেন ধান-চালের ব্যবসাকে। পরে, ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের সময় প্রচুর সম্পদের মালিক হয়ে ওঠে এই পরিবারটি। ১৭৯৩ সাল। লর্ড কর্ণওয়ালিশ ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ প্রথা প্রচলন করলেন। সম্পদের মূল্যে, সম্পত্তির সনন্দ জোগাড় করল পরিবারটি। ব্যবসায়ী থেকে জমিদার হয়ে উঠলেন তাঁরা। জমিদারী পেয়েই, বসতবাড়ির সাথে সাথে তিনটি বড় আকারের মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জমিদাররা।
কেবল জমিদারী পরিচালনা নয়, স্বাধীনতা আন্দোলনেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে এই বংশ।

 

বেশ কয়েকজন স্বাধীনতা সংগ্রামীর জন্ম হয়েছিল এই পরিবারে। বসন্ত কুমার মহাপাত্রের ডাকে ক্ষুদিরাম বসু এসেছিলেন এখানে। বিপ্লবীদের ‘আখড়া’ গড়ে দিয়ে গিয়েছিলেন পাঁচরোলে। নবীনচন্দ্র ছিলেন নেতাজীর ‘বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স’-এর সদস্য। ‘ভারত-ছাড়ো’, ‘আইন অমান্য’ আন্দোলন ইত্যাদি ব্রিটিশ শাসন বিরোধী সমস্ত কর্মকান্ডে সামিল ছিলেন জমিদাররা। ডা. হেমন্ত কুমার, ড. ক্ষিতীশচন্দ্র, নির্মল কুমার, ভুপেন্দ্রনাথ, গিরীজাকান্ত, বিরজাকান্ত, বিনয় কুমার প্রমুখ ছিলেন সক্রিয় বিপ্লবী। দেশ স্বাধীন হলে, শেষ পাঁচ জন সরকারী ‘তাম্রপত্র’-এ ভূষিত হয়েছিলেন।


তিনটি মন্দির এই পরিবারের। প্রধান মন্দিরটি কুলদেবতা রাধাবিনোদের। শ্রীকৃষ্ণের মন্দির। বারো মাসে তেরো পার্বণের আয়োজন ছিলই। জমিদারীর বৈভবে সমস্ত পূজাই জাঁকজমকের সাথে আয়োজন করা হোত। ঝুলন উৎসব, রাসযাত্রা আর দোল পূর্ণিমা– তিনটি উৎসবই আয়োজিত হোত মহা আড়ম্বরে। বিপুল লোকসমাগম হোত মন্দিরে। বিপ্লবী কর্মকান্ড আর তার প্রচারের সহায়ক হোত উৎসবগুলি।
এবার আমরা বিশাল মন্দিরসৌধটির নির্মাণশৈলীর দিকে তাকাতে পারি। ইটের তৈরী পূর্বমুখী দেবালয়। ফুট দুয়েক উঁচু পাদপীঠের উপর প্রথমে একটি দালান মন্দির। সেটির মাথায় বিশাল আকারের শিখর দেউল রীতির বিমান অংশটি স্থাপিত হয়েছে। উচ্চতা আনুমানিক ৭০ ফুট। এত উঁচু মন্দিরসৌধ মেদিনীপুর জেলায় বুঝি আর নাই।


বিমানের সামনে চালা-ছাউনির, আনুমানিক ৬০ ফুট উঁচু, পঞ্চদ্বারী একটি জগমোহন। পরবর্তী কালে দালান-রীতির, বিশ-দ্বারী, একটি বিশাল আকারের নাটমন্দির নির্মিত হয়েছে জগমোহনের সামনে। দৈর্ঘ্য সাড়ে ৪৭ ফুট, প্রস্থ পৌনে ২৬ ফুট, উচ্চতা ২৭ ফুট। জগমোহনের দ্বিতল অংশটিও পঞ্চদ্বারী। বিমানের দ্বিতলেও একটি গর্ভগৃহ আছে, তাতে একটিই দ্বারপথ। মন্দিরের সবগুলি দ্বারপথ খিলান-রীতির। সামনের দেওয়ালের সবগুলিই গুচ্ছরীতির থাম। মেদিনীপুর জেলায় এত বিশাল বিমান এবং নাটমন্দির আর দ্বিতীয়টি নাই।


সৌধের আকার বিশাল হলে, তার কারিগরি সিলিংয়ের উপর বেশি নির্ভরশীল। এখানে জগমোহনের সিলিং হয়েছে টানা-খিলান করে। গর্ভগৃহের সিলিং দু’দিকে দুটি খিলানের মাথায় লম্বা গম্বুজ স্থাপন করে নির্মিত হয়েছে। বিমান সৌধটিতে সপ্তরথ বিভাজন করা হয়েছে। জগমোহনের ছাউনি বা গন্ডী অংশে পীঢ়-রীতিতে থাক কাটা।
মন্দিরে অলংকরণের কাজ যতটুকু আছে, সবই পঙ্খের কাজ। টেরাকোটা-র ব্যবহার নাই। নাটমন্দিরের দেওয়ালে পঙ্খের কিছু নকশি কাজ আছে। বিমান সৌধের উত্তর, পশ্চিম এবং দক্ষিণের দেওয়ালে বরন্ডর নীচ বরাবর কয়েকটি মূর্তি স্থাপিত হয়েছে। মোটিফ হিসাবে সেখানে বাতায়নবর্তিনী, মানব-দম্পতি, নৃসিংহদেব প্রভৃতি মূর্তি দেখা যায়।
এমন বিশাল আকার, বিশিষ্ট রীতি আর সুদর্শন মন্দির এই জেলায় কমই আছে। কিন্তু কালের আঘাতে মন্দিরটি জীর্ণ। জমিদারী উচ্ছেদ হয়ে গিয়েছে কবেই। মন্দির সংস্কারের সাধ থাকলেও, সাধ্য আর নাই সেবাইত বংশের। সরকার উদ্যোগী না হলে, প্রাচীন এই ঐতিহ্যটি বাঁচানো যাবে না।
সাক্ষাৎকার : সর্বশ্রী রাখহরি মহাপাত্র, স্বপন মহাপাত্র, পীযূষ মহাপাত্র, পিনাকী মহাপাত্র, জনার্দন সৎপতি (পুরোহিত)– পাঁচরোল। নিখিল রঞ্জন মহাপাত্র, সৌম্যদীপ মহাপাত্র– বেলদা।
যাওয়া-আসা : মেদিনীপুর কিংবা কাঁথি থেকে এগরা। সেখান থেকে কুদি, আলংগিরি হয়ে, কসবাগোলা রাস্তায় পাঁচরোল গ্রাম। দীঘা থেকে রামনগর হয়েও পাঁচরোল যাওয়া যায়। দুটিই মোটরেবল রোড।   প্রচ্ছদ -রামকৃষ্ণ দাস