জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল– ৪৮

793
জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল-- ৪৮ 1

জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল– ৪৮
জগন্নাথ মন্দির, বাসুদেবপুর (এগরা- ২ ব্লক)
চিন্ময় দাশ

 

জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল-- ৪৮ 2

জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল-- ৪৮ 3অবিভক্ত বাংলার একেবারে দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তের জেলা মেদিনীপুর। খ্রিস্টীয় ১৬ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে এখানে প্রথমে পাঠান এবং পরে মোগল শক্তির অধিকার পুরোপুরি প্রতিষ্ঠা হয়। কিন্তু তার পূর্বে, ১২ শতক থেকে ১৬ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত, জেলার প্রায় সমগ্র ভূখন্ড ছিল কলিঙ্গের রাজাদের শাসনের অধীন। রাজা চোড়গঙ্গদেব এই শাসনের সূচনা করেছিলেন। \

জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল-- ৪৮ 4
সাড়ে চার শ’ বছর কম দীর্ঘ নয়। এই সময়কালে ওডিশার সংস্কৃতির গভীর প্রভাব পড়েছিল মেদিনীপুর জেলার উপর। বিশেষত মন্দির স্থাপত্যে তার প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি। মেদিনীপুর জেলার দক্ষিণ এবং পশ্চিম অংশে আজও যত দেবালয় দেখা যায়, তার অধিকাংশই নির্মিত হয়েছে ওডিশী দেউল রীতিতে। সিংহভাগই শিখর দেউল, বাকিগুলি পীঢ় বা ভদ্র শৈলীর।

জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল-- ৪৮ 5
এই জেলার দক্ষিণের একটি থানা এগরা। এখানে বিখ্যাত শিখর মন্দিরগুলি আছে– কসবা এগরা, আদলাবাদ, পাঁচরোল, আলংগিরি গ্রামে। সেই তালিকায় বাসুদেবপুর একটি উল্লেখযোগ্য নাম। এই গ্রাম ছিল জলামুঠা পরগণার জমিদারদের রাজধানী। তাঁরা তিনটি বিখ্যাত মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রাজবাড়ির লাগোয়া করে– জগন্নাথ মন্দির, রামচন্দ্র মন্দির এবং কুমারীশ্বর শিব মন্দির। এর ভিতর জগন্নাথ মন্দিরটি ছিল শ্রেষ্ঠ। শিখর-রীতিতেই নির্মিত হয়েছিল সেটি।

জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল-- ৪৮ 6
মেদিনীপুর জেলার একমাত্র মুসলমান জমিদার ছিলেন তাজ খাঁ ‘মসনদ-ই-আলা’। সমুদ্রলগ্ন হিজলী ছিল তাঁর রাজধানী। তাজ খাঁর পুত্র বাহাদুরের মৃত্যুতে, পরম ধার্মিক শাসক তাজ খাঁর হিজলী রাজ্য তিনটি পরগনায় ভাগ হয়ে যায়– মাজনামুঠা, জলামুঠা এবং সুজামুঠা। জনৈক কৃষ্ণ পণ্ডা জলামুঠায় তাঁর জমিদারী পত্তন করেছিলেন।

জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল-- ৪৮ 7
কৃষ্ণ পণ্ডার পুত্র হরিনারায়ণ নবাব দরবার থেকে ‘চৌধুরী’ খেতাব পেয়েছিলেন। পরে এই বংশ ‘রায়’ খেতাব পেয়ে, সেটি পদবি হিসাবে ব্যবহার শুরু করে। ১৭৭০ সালে ইংরেজরা এই বংশকে ‘রাজা’ উপাধিতে ভূষিত করেছিল।
এই বংশের একেবারে শেষ পর্বে রাজা ছিলেন নরনারায়ণ রায়। ‘রাজা’ উপাধি পাওয়া বীরনারায়ণের পুত্র নরনারায়ণ ছিলেন এই বংশের সফল এবং শ্রেষ্ঠ রাজা। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি তাঁর রাজত্বকাল– ১৭৯৭ থেকে ১৮৩৯। ১৮০১ সালে গভর্ণর জেনারেল লর্ড ওয়েলেসলীকে মেদিনীপুরের জেলা কালেক্টর স্ট্রেচি সাহেব, জেলার সম্ভ্রান্ত ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যে তালিকা পাঠিয়েছিলেন, তাতে নরনারায়ণ রায়ের নাম উল্লেখ করা হয়েছিল।
আলোচ্য এই জগন্নাথ মন্দিরে কোনও প্রতিষ্ঠা-ফলক নাই। তবে স্থাপত্য বিচার করে, পূর্ববর্তী পুরাবিদরা মন্দিরটি ১৮ শতকের শেষ দিকে নির্মিত বলে অনুমান করেছেন। আমাদের অভিমত, রাজা নরনারায়ণের হাতেই মন্দিরটি নির্মিত হয়ে থাকবে।

জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল-- ৪৮ 7
শিখর-দেউল রীতির এই মন্দিরের তিনটি অংশ– পিছনে বিমান, সামনে জগমোহন। মাঝখানে একটি ছোট অন্তরাল অংশ। একটি স্নান বেদীও ছিল দেবতার। নাটমন্দির বা ভোগমন্ডপ নাই এখানে। ২৪ ফুট দৈর্ঘ্য-প্রস্থের বিমান অংশের উচ্চতা আনু. ৫০ ফুট। জগমোহন ২০ ফুট দীর্ঘ, ১৪ ফুট প্রস্থ বিশিষ্ট। উচ্চতা ৩৩ ফুট। অর্থাৎ সামগ্রিক সৌন্দর্য বিধানের জন্য বিমানের উচ্চতার দুই-তৃতীয়াংশ। মধ্যবর্তী অন্তরালটির দৈর্ঘ্য ৩ ফুট। শিখর-শৈলীর ‘রথপগ বিন্যাস’ অনুসরণ করে, বিমান সৌধে ‘নব-রথ’ বিভাজন করা। জগমোহনটি পীঢ়-শৈলীর। তাতে ‘সপ্ত-রথ’ বিভাজন। বিমান এবং জগমোহনের সিলিং গড়া হয়েছিল খিলানের মাথায় গম্বুজ নির্মাণ করে। অন্তরালের সিলিং করবেলিং রীতির।

জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল-- ৪৮ 9
পূর্বকালে জগমোহনের সামনের দেওয়ালে স্টাকোর কয়েকটি মূর্তি ছিল। মন্দিরের বরন্ড অংশের নীচে দুটি সারিতে। পশু-পক্ষী সহ কয়েকটি মানবমূর্তি এবং মিথুনমূর্তি। এছাড়া, গর্ভগৃহের ভিতরে, দক্ষিণের দেওয়ালে উপরের অংশে, একটি শিল্পকর্ম বহুকাল টিকে ছিল। একটি কদম্ব বৃক্ষের তলায় বংশীধারী শ্রীকৃষ্ণ এবং রাধারানি। সেটি পঙ্খের রঙিন কাজ। এত বড় একটি মন্দিরে আর কোনও শিল্পকর্ম নাই।
সুধী পাঠক-পাঠিকাগন, পুরো নিবন্ধটিকে অতীত স্মৃতিচারণ হিসাবে গ্রহণ করতে হবে আপনাদের। আমরা একাধিক বার এই মন্দির সমীক্ষা করেছি। সরেজমিনে শেষ দেখি সাড়ে তিন বছর আগে, ২০১৬ সালের জুন মাসে। তখনই রামচন্দ্র মন্দিরটি ভেঙে ফেলা হয়েছিল।

জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল-- ৪৮ 10বিগ্রহগুলি এই মন্দিরে এনে রাখা হয়েছিল। কাঁথি থানার বাহিরী গ্রামের বিখ্যাত জগন্নাথ মন্দির থেকে জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রার তিনটি বিগ্রহ নিয়ে আসা হয়েছিল। সেগুলি এই মন্দিরেই রাখা আছে। যদিও তখনই ভারী জীর্ণ দশা ছিল এই জগন্নাথ মন্দিরের। বর্তমানে আর মন্দিরটির অস্তিত্বই নাই। সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলা হয়েছে।
এই নিবন্ধের ছবিগুলি ২০১৬ সালের।
যাওয়া-আসা : মেদিনীপুর-খড়গপুর-কাঁথি রাস্তায় সাতমাইল। সেখান থেকে ২ কিমি পশ্চিমে বাসুদেবপুর গড়বাড়ি ও মন্দিরতলা।

 

সাক্ষাৎকার : সর্বশ্রী জ্যোতির্ময় রায়, পুলিন বিহারী মাইতি, শশাঙ্ক শেখর পণ্ডা (পুরোহিত), রামপদ রথ, পার্থসারথী দাস– বাসুদেবপুর।

Previous articleআবার সে এসেছে ফিরিয়া! লকডাউনের সুফল, ঘাটালের গ্রামে ৭ দশক পরে ফিরল পরিযায়ী, সতর্ক করলেন বন আধিকারিক
Next articleজিও ফোন ব্যবহারকারীদের জন্যও লঞ্চ হল আরোগ্য সেতু অ্যাপ