দ্বিতীয় পান্ডবের বীরত্বে অনুপ্রাণিত যাত্রাপাগলদের শুরু করা ভীম পূজা এখন শালবনীর ঐতিহ্যবাহী পূজো

171
দ্বিতীয় পান্ডবের বীরত্বে অনুপ্রাণিত যাত্রাপাগলদের শুরু করা ভীম পূজা এখন শালবনীর ঐতিহ্যবাহী পূজো 1
দ্বিতীয় পান্ডবের বীরত্বে অনুপ্রাণিত যাত্রাপাগলদের শুরু করা ভীম পূজা এখন শালবনীর ঐতিহ্যবাহী পূজো 2

 

পলাশ খাঁ, গোয়ালতোড় :- ছোটো বেলাতে দাদু ঠাকুমাদের কাছে রামায়ণ মহাভারতের গল্প শুনতেন৷ সেই গল্প শুনতে শুনতেই তাদের কাছে স্বপ্নের নায়ক হয়ে উঠেন মহাভারতের দ্বিতীয় পান্ডব ভীম গুঁইরাম, দুর্গাপদ, ভবসিন্ধু, সনৎ দের। বড়ো হয়ে তাদের যাত্রার নেশা যেন পেয়ে বসে। সংসারের দায়িত্ব সামলেও ফি বছরেই নিয়ম করে সকলে মিলে যাত্রা করতেন। তাদের এই যাত্রার নেশা দেখে গ্রামের লোকে তাদের ডাকতেন যাত্রা পাগল বলে। গ্রাম ছাড়িয়ে দূরদূরান্তেও তাদের এই যাত্রাপাগল নাম ছড়িয়ে পড়ে। গড়মাল গ্রামের সেই যাত্রাপাগল গুঁইরাম খাঁড়া, দুর্গাপদ চক্রবর্তী, ভবসিন্ধু ভান্ডারী, সনৎ ভান্ডারীরা মিলে ঠিক করেন তাদের স্বপ্নের নায়ক মহাভারতের দ্বিতীয় পান্ডব ভীমের পুজো করে তার বীর গাঁথাকে তুলে ধরবেন৷ সেই ভাবনারই ফসল শালবনীর ঐতিহ্যবাহী গড়মালের ভীম পুজো। ৭৭ বছর পরেও যা এখন গ্রামের প্রধান উৎসব।

দ্বিতীয় পান্ডবের বীরত্বে অনুপ্রাণিত যাত্রাপাগলদের শুরু করা ভীম পূজা এখন শালবনীর ঐতিহ্যবাহী পূজো 3

 

পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার একেবারে শেষ প্রান্তে অবস্থিত জঙ্গল ঘেরা গ্রাম গড়মাল৷ তদানিন্তন গ্রামবাসীরা মূলত চাষাবাদের উপর নির্ভর করতো। সারাদিন মাঠের কাজ সেরে বড়ি ফিরে সন্ধ্যে বেলায় গ্রামের বয়স্করা একজায়গায় জোড় হয়ে রামায়ণ মহাভারতের কাহিনী আলোচনা করতেন৷ বয়স্কদের হাত ধরে মাঝে মধ্যে সেই আলোচনায় অংশ নিত গুঁইরাম দুর্গাপদ, ভবসিন্ধু, সনৎরা। বড়োদের মুখে মহাভারতের কাহিনী শুনতে শুনতেই তাদের মনের অগোচরেই দ্বিতীয় পান্ডব ভীম হয়ে উঠেন স্বপ্নের নায়ক। ভীমের আদর্শ যেন তাদের পেয়ে বসে। পরে বড়ো হয়ে তারা ঠিক করেন ভীমের বীরত্বের কথা সকল মানুষকে জানাতে হবে৷ কাজের ফাঁকে তারা গঠন করেন নিজেদের যাত্রাদল৷ গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষ গুলো তখন তাদের এই যাত্রা দল গঠন করা দেখে ‘গরীবের ঘোড়া রোগ’ কিম্বা ‘যতসব আদিখ্যেতা’ বলে মনে করতেন৷ কিন্তু যাত্রার নেশা তাদের এমনই পেয়ে বসে যে কারো কথায় কোনো কর্ণপাত না করে তারা তাদের লক্ষ্যে এগিয়ে চলে। ফি বছরই গড়মাল সহ একালার বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে যাত্রাপালা অভিনয় করতে শুরু করেন৷ তাদের অভিনয় গুনে মুগ্ধ হয়ে উঠেন এলাকাবাসী। তাদের এই যাত্রার প্রতি অগাধ ভালোবাসা দেখে এলাকার মানুষ তাদের যাত্রা পাগল বলে ডাকতেন৷ সেই যাত্রাপাগলরা একদিন ঠিক করেন যে ভীমের পুজো করে যাত্রা পালার আয়োজন করবেন। তৎকালীন সময়ে এলাকায় সেভাবে উৎসব ছিল না বললেই চলে। ফলে প্রথম বছরেই ভীম পুজো উপলক্ষে ভীড় উপচে পড়ে। প্রথম দিকে দুদিনের মেলা হলেই এখন সেই মেলায় হয়েছে সপ্তাহ ব্যাপী। যাত্রা পাগলদের শুরু করা প্রথা অনুয়ায়ী সাতদিন ব্যাপী যাত্রাগানের লড়াই হতো, তবে এই রীতি ভেঙ্গে বর্তমান প্রজন্মের আয়োজকরা সাত দিনে রামধেনু অনুষ্ঠান করেন। ভীম ঠাকুরের পাকা বেদীতে বসে গ্রামের বয়স্ক নিরাপদ চক্রবর্তী, ধরণী ভান্ডারীরা মেলার স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে বলেন, ছোটো বেলা থেকে দেখেছি হ্যাজাক লাইট দিয়েই গ্রামের মানুষেরা যাত্রার আয়োজন করতো, এখন সেই হ্যাজাকের পরিবর্তে এসেছে বৈদ্যুতিক আলো৷ বেড়েছে মেলার বহর৷ বর্তমান মেলা কমিটির কর্মকর্তা নোটন ভান্ডারী, বিকাশ দত্তরা বলেন, “এলাকার মানুষের চাহিদা মতোই অনুষ্ঠান সুচী রাখা হয়। তবে ৭৭ বছর পরেও এখনো গড়মালের ভীম পুজো এলাকার মানুষের প্রধান উৎসবে পরিনত হয়ে রয়েছ। পুজো উপলক্ষে আয়োজন করা হয় মেলার। গ্রামের প্রত্যেকের বাড়িতে আত্মীয় স্বজনরা আসেন, চলে খাওয়াদাওয়া হৈ-হুল্লোড়। গৃহস্থ কূলবধুরা রংচটা দেওয়ালে নতুন রং এর ছোপ দেন। পুজোর কয়েকদিন আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় ব্যাস্ততা।
গ্রামের গৃহবধূ শিবানী দত্ত রঙ করা দেওয়ালে নিপুন হাতের আল্পনা দিতে দিতেই বলেন, “এই ভীম পুজোই আমাদের প্রধান উৎসব৷ এই পুজো উপলক্ষে বাড়িতে আত্মীয় স্বজনরা আসেন, তাই প্রতি বছরই এই পুজোতেই ঘর ঝাড়পোঁছ করা, নিকানো, আর সাজানো গোছানোর কাজ করতে হয়। তাই পুজো শুরুর আগেই আমাদের ব্যাস্ততা থাকে তুঙ্গে”।
কলেজ পড়ুয়া মামনী বিষই, সাথী খাঁড়ারা জানান, “প্রতিবছর আমরা এই সাতটা দিনের জন্য অপেক্ষা করে থাকি। বন্ধ পড়াশুনো, বন্ধুবান্ধব দের সঙ্গে চলে চুটুল আড্ডা, খাওয়াদাওয়া।

পুজো তে যেমন এলাকার মানুষেরা এগিয়ে আসেন তেমনই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন স্থানীয় পঞ্চায়েত গড়মালের গ্রাম পঞ্চায়েত বিশ্বজিৎ সিং জানান, এটা আমাদের ঐতিহ্যবাহী পূজো । সেই পূজোর ঐতিহ্য ধরে রাখতে আমাদের সকলের এগিয়ে আসা উচিত।