ঘরের মেঝেতে পড়ে রয়েছেন বৃদ্ধা, করোনাতঙ্কে ৬ ঘন্টা কেটে গেলেও ছুঁলেন না পরিবার

78

ওয়েব ডেস্ক : ঘরের মেঝেতে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে রয়েছেন বৃদ্ধা। গোঙানির আওয়াজ এতটাই তীব্র যে শুনেই বোঝা যাচ্ছে, প্রচন্ড কষ্ট পাচ্ছেন তিনি। এদিকে পাশের ঘরেই রয়েছেন পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ এভাবে মেঝেতে পড়ে থাকলেও দেখা নেই কারও। গোঙানির আওয়াজ পেয়ে একে একে অনেক প্রতিবেশীই এসেছিলেন৷ কিন্তু আসাই সাড়! একে একে সকলেই উঁকি মেরে চলে গেলেন। কিন্তু করোনা আতঙ্কে কেউ ছুঁয়েও দেখলেন না বৃদ্ধাকে৷ এদিকে কিছুক্ষণের মধ্যে গোটা পাড়ায় খবর ছড়িয়ে পড়ল, বৃদ্ধা করোনায় আক্রান্ত। সকাল থেকে প্রায় বিকেল পর্যন্ত মেঝেতেই পড়ে রইলেন বৃদ্ধা। প্রায় ৬ ঘন্টা পর খবর পেয়ে শেষে উত্তর কলকাতার শ্যামপুকুর থানার পুলিশ এসে বৃদ্ধাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা বৃদ্ধাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। মর্মান্তিক এই ঘটনার সাক্ষী থাকলো শ্যামপুকুরের বৃন্দাবন পাল লেন।

জানা গিয়েছে, বৃন্দাবন পাল লেনের একটি বাড়িতে ভাড়া থাকতেন বছর ৭০ এর ছায়া চট্টোপাধ্যায়। কয়েকবছর আগেই মৃত্যু হয়েছে তাঁর স্বামী অনুপ চট্টোপাধ্যায়ের। একই বাড়িতে পাশের ঘরেই থাকেন বৃদ্ধার দেওর ও তাঁর পরিবার। কিন্তু পারিবারিক অশান্তির কারণে তাদের সাথে সম্পর্ক ভেঙে গিয়েছে অনেকদিন। এদিকে কয়েকদিন আগেই পড়ে গিয়ে পায়ে আঘাত পেয়েছিলেন ছায়া দেবী। অযত্নে কাটা জায়গায় ঘা হয়ে গিয়েছে। তার ফলে অসুস্থ হয়ে পড়ে ছিলেন বৃদ্ধা। রবিবার সকালে তাঁর বাড়িওয়ালার পুত্রবধূ বাজারে যাওয়ার সময় দেখেন, দরজার কাছে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। বাজার থেকে ফিরে আসার পর দরজার বাইরে পায়ের অংশ দেখতে পেয়ে তাঁর সন্দেহ হয়। ঘরের ভিতর ঢুকে দেখেন, দরজার চৌকাঠের কাছেই মেঝেয় পড়ে রয়েছেন বৃদ্ধা। যন্ত্রনায় গোঙাচ্ছেন ছায়া দেবী৷ বিষয়টি দেখা মাত্র ওই মহিলা বৃদ্ধার দেওরকে জানান। কিন্তু তাতেও লাভ হয়নি।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ছায়া দেবীর স্বামী মারা যাওয়ার আগে দুইভাইয়ের বিবাদের জেরে দুই পরিবারের সম্পর্ক খুব একটা ভাল ছিল না। তাই পাশের ঘরে পরিজন থাকা সত্ত্বেও নিজের মতো একাই থাকতেন তিনি। এদিন সকালে ঘটনার কথা জানাজানি হতে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেও করোনা আতঙ্কে বৌদিকে ছোঁননি দেওর। দেওরের দাবি, ঘটনাটি দেখার পর পরই তিনি স্থানীয় এক চিকিৎসককে ফোন করেছিলেন। কিন্তু চিকিৎসক সব শুনে বৌদি করোনায় আক্রান্ত ভেবে আর আসেননি। যদিও পুলিশের ধারণা এই ব্যক্তি আদেও সত্যি বলছেন কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে৷

আরও পড়ুন -  সবংয়ের জন্য জোড়া সোনা আনছে সোনার মেয়ে সম্প্রীতা

তাদের দাবি, সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত ওই অবস্থায় যদি বৃদ্ধাকে ফেলে না রেখে আগেই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া যেত কিংবা অন্তত পুলিশকে বিষয়টা জানানো হত, তাহলে হয়তো বৃদ্ধাকে বাঁচিয়ে তোলা সম্ভব হয়ে যেত৷ কিন্তু এভাবে দীর্ঘ ৬ ঘন্টা পড়ে থেকে আরও অসুস্থ হয়ে যান বৃদ্ধা৷ এবিষয়ে এক প্রতিবেশী পুলিশকে জানিয়েছেন, যেহেতু ওই অঞ্চলে কয়েকজন বাসিন্দা ইতিমধ্যেই করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন সেহেতু আতঙ্কে তাকে কেউ ছুঁতে চাননি। কিন্তু এখানেই প্রশ্ন উঠছে যে দীর্ঘ ৬ ঘন্টা বৃদ্ধাকে ফেলে রাখা হল অথচ পুলিশ কিংবা এলাকার প্রশাসনকে জানানো হল না কেন? সেই প্রশ্নের উত্তর অবশ্য দিতে পারেননি পরিবার থেকে প্রতিবেশী কেউই৷

আরও পড়ুন -  মহারাষ্ট্রর সরকার গঠনের জালিয়াতিতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন মরিয়া মোদীও ! শরদ কন্যাকে দিয়েছিলেন মন্ত্রীত্বের প্রস্তাব

এবিষয়ে এক পুলিশকর্মী জানান, এদিন বিকেল ৩টে নাগাদ শ্যামপুকুর থানায় ফোন আসে। সেই সময় শ্যামপুকুর থানার তরফে লালবাজারে জানানো হলে সঙ্গে সঙ্গেই লালবাজারের তরফে বৃদ্ধার বাড়িতে অ্যাম্বুল্যান্স পাঠানো হয়। সেসময় শ্যামপুকুর থানায় পিপিই ছিল না। কিন্তু ঘটনা এতটাই মর্মান্তিক যে সেসময় সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা মাথায় না নিয়ে শুধুমাত্র বৃদ্ধাকে বাঁচাতে পুলিশ অফিসাররা গ্লাভস আর মাস্ক পরেই স্ট্রেচারে করে ওই বৃদ্ধাকে অ্যাম্বুল্যান্সে তোলেন। সে সময় একেবারেই নিস্তেজ হয়ে গিয়েছিল বৃদ্ধার দেহ। এরপর তাকে আরজি কর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার হলে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। তবে আদেও ওই বৃদ্ধার করোনা সংক্রমণ ছিল কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে৷ শুধুমাত্র সন্দেহের বশেই এক বৃদ্ধার ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এক পুলিশ অফিসার জানান, বৃদ্ধার আদৌ করোনা হয়েছিল কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। ঘটনায় পুলিশের তরফে বৃদ্ধার প্রতিবেশী ও পরিজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

ঘরের মেঝেতে পড়ে রয়েছেন বৃদ্ধা, করোনাতঙ্কে ৬ ঘন্টা কেটে গেলেও ছুঁলেন না পরিবার 1