সঙ্গে রুকস্যাক -১ পার্থ দে

344
সঙ্গে রুকস্যাক -১  পার্থ দে 1
সঙ্গে রুকস্যাক -১  পার্থ দে 2

স্রোতের টানে ভাটিন্ডা
 পার্থ দে

জলপ্রপাতের নাম করলেই রাঁচির হুড্রু, জোনা বা দশম ফলসের নাম সবার আগে উঠে আসে। বিখ্যাত হওয়ার সুবাদে বহু মানুষ এই জলপ্রপাতগুলি দেখতে ছুটে যান। কিন্ত জানেন কি, রাঁচি না গিয়েও কোলকাতার কাছেই ঝাড়খন্ড রাজ্যের আরেকটি সুন্দর জলপ্রপাত আছে। অবশ্য এটাকে জলপ্রপাত না বলে ঝর্ণা বলাই ভালো। হয়তো জোনা ফলসের মতো উচ্চতা নেই, কিন্ত সৌন্দর্যে তার থেকে কোন অংশে কম নয়। এরকম এক বর্ষামুখর দিনে ঘুরে আসতেই পারেন। কোলকাতা থেকে মাত্র ২৮০ কিমি।

রাতের ট্রেনে সফর আমার কাছে সবসময় রোমাঞ্চকর। আর একটা সুবিধা হল সারাদিনের কাজ সেরে ট্রেনে চড়ে সকাল সকাল গন্তব্যে পৌঁছানো যায়। তার মানে দিনের পুরোটা সময় প্রকৃতির মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলা। সেইমতো আমরা দুই বন্ধু রাতের যোধপুর এক্সপ্রেস ধরে ভোর সাড়ে তিনটে নাগাদ ধানবাদ স্টেশন পৌঁছে গেলাম। তখনও অন্ধকার কাটে নি। স্টেশনের বাইরে বেরিয়ে প্রচুর লোকজন, পেপারওয়ালা-সবজীওয়ালাদের ব্যস্ততা তুঙ্গে। এত ভোরে চা দোকান ছাড়াও আরো অনেক দোকান খোলা রয়েছে। বাইরে দু একটা অটোর সঙ্গে কথা বললাম। যেটা বুঝলাম, আমার গন্তব্য ভাটিন্ডা ফলস এখান থেকে ১৭ কিমি। আপ-ডাউন অটো রিজার্ভ করতে হবে, খরচ প্রায় ৫০০ টাকা । এরপর একটা দোকানে চা খেয়ে একটু খোঁজ খবর নিলাম কিভাবে কম খরচে স্পটে পৌঁছানো যায়। জানতে পারলাম, স্টেশন থেকে মিনিট পাঁচেক হেঁটে গেলে একটা তিনমাথার মোড় পড়বে, ওখান থেকে রুটের অটোতে মাথাপিছু মাত্র ২০ টাকায় মুনিডি পর্যন্ত নিশ্চিন্তে যাওয়া যাবে। ওখান থেকে আড়াই কিমি দূরে স্পট। আমরা দুজন এইপথেই চললাম। অটোতে মুনিডি পৌঁছে ওখান থেকে বাকি পথটা রোজকার অভ্যাস মতো মর্নিং ওয়াক করতে করতে পৌঁছে গেলাম।।

সঙ্গে রুকস্যাক -১  পার্থ দে 3

সঙ্গে রুকস্যাক -১  পার্থ দে 4

সবে সকাল হয়েছে। একটা গ্রামের মধ্য দিয়ে চলেছি। বাড়ির পুরুষেরা নিমকাঠি দিয়ে দাঁত ঘষছে। দু একটা ছোট বাচ্চা সবে ঘুম ভেঙে হাই তুলছে আর চোখ ঘষছে। মহিলারা পাতকূঁয়ার ধারে বসে বাসন মাজছে। কেউবা ঝাঁটা দিচ্ছে। গ্রামটা শেষ হতেই চারিদিকে সবুজের সমারোহ কয়েক গুণ বেড়ে গেল। সেইসঙ্গে পাখিদের কলকাকলীর মাঝে এক নৈসর্গিক পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। ভাটিন্ডা ধাম লেখা প্রবেশ তোরণ পেরিয়ে এগোলেই একটা জলপ্রবাহের শব্দে নীরবতা ভঙ্গ হয়। মনে হল বিশেষ কিছু প্রাপ্তিযোগ আছে।

কিছুটা যেতেই একটা মন্দির, তার ঠিক পেছনের দিকে একটা ভিউ পয়েন্ট থেকে বিশ ত্রিশ মিটার দূরে সেই বহু আকাঙ্খিত ঝর্ণাটি চোখে পড়ে। পোশাকি নাম ভাটিন্ডা ফলস্। কাতরি নদীর প্রবল জলোচ্ছ্বাস সশব্দে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। মূল জলধারা ৩০ ফুট উপর থেকে বেশ কয়েকটি ধাপের উপর দিয়ে নিচের দিকে প্রবাহিত হয়েছে। তাই উচ্চতার তুলনায় ঝর্নাটি অনেকটাই চওড়া। ফটোগ্রাফির জন্য আদর্শ যায়গা। বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে লেন্সবন্দী করা যায় ভাটিন্ডাকে। চারিদিকে কয়লাখনি আর রুক্ষ পাথুরে জমির মাঝে নিরালা এই যায়গাটিকে প্রকৃতি তার বিপুল জলরাশির ধ্বনিতে মুখরিত করে রেখেছে। এই বিপুল জলরাশি যেন হাতছানি দিয়ে কাছে ডাকে। কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ভাষায়,

“ঝর্ণা ! ঝর্ণা ! সুন্দরী ঝর্ণা !
তরলিত চন্দ্রিকা ! চন্দন-বর্ণা !
অঞ্চল সিঞ্চিত গৈরিকে স্বর্ণে,
গিরি-মল্লিকা দোলে কুন্তলে কর্ণে,
তনু ভরি যৌবন, তাপসী অপর্ণা !”

 

সঙ্গে রুকস্যাক -১  পার্থ দে 5

মনে হবে একবার ছুঁয়ে দেখি। জলের কাছে গেলেই গা শিউরে উঠবে। কি ভীষন স্রোতের টান। যেন এক নিমেষে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। এখনও পর্যন্ত বেশ কয়েকটি তাজা প্রাণ স্রোতের টানে ভেসে গেছে। তাই সামাজিক দূরত্ব মেনেই ভাটিন্ডার সঙ্গে আলাপ পর্ব সেরে ফেললাম। বর্ষাকালে ঝর্ণা বা জলপ্রপাতের আসল রূপ খোলে। জলের স্রোতে মৎসজীবিদের মাছধরার ব্যস্ততা চোখে পড়ে। প্রাথমিক পর্বে চোখ আর ক্যামেরাকে ব্যাস্ত রাখলাম। এরপর ঝর্ণার পাশে বসে বসে কিভাবে যে সময় কেটে গেল বুঝতেই পারলাম না। নদী ও ঝর্ণার আনন্দধারা হৃদমাঝারে প্রশমিত হয়ে গেল। পাশের বিনোদ বিহারী পার্কে বসার জন্য বেশ কিছু জায়গায় বেঞ্চ বানানো আছে। ওখানে আরো কিছু সময় বসে থেকে প্রকৃতির রূপসুধা পান করতে থাকলাম। একদল তরুন তরুনীদের উল্লাসধ্বনি শুনে সম্বিত ফিরল।

পার্কের বেঞ্চগুলো ভরে ওঠল। আমিও প্রকৃতির মায়া কাটিয়ে এবার উঠে পড়লাম। আসার মতোই একই ভাবে মুনিডি থেকে অটোতে ধানবাদ ফিরে গেলাম। ধানবাদ থেকে বিকেলের ব্ল্যাক ডায়মন্ডে সোজা হাওড়া। আপনারা ইচ্ছে করলে ধানবাদের কোন হোটেলে দু-একদিন থেকে আশেপাশের আরো কিছু স্পট ঘুরে নিতে পারেন।

যাতায়াত :- হাওড়া/শিয়ালদহ থেকে ধানবাদের অনেক ট্রেন আছে। হাওড়া থেকে সকাল ০৬.০৫ এর রাঁচি শতাব্দী, ০৬.১৫ এর ব্ল্যাক ডায়মন্ড এক্সপ্রেস অথবা রাতে যেতে চাইলে ২৩.৩৫ এর যোধপুর/বিকানীর এক্সপ্রেস সুবিধাজনক হবে। স্টেশন থেকে ভাটিন্ডা ফলস্ ১৭ কিমি। অবশ্যই দরদাম করে অটো রিজার্ভ করবেন। আর যদি আমার মতো খরচ কমাতে চান তবে রুটের অটোতে মুনিডি পৌঁছে বাকি আড়াই কিমি পথ হাঁটতে হবে। নিজস্ব গাড়ি বা কোলকাতা থেকে রাতের ভলভো বাসে করেও ধানবাদ যেতে পারেন। এখানে যাওয়ার আদর্শ সময় আগস্ট থেকে নভেম্বর।

থাকা-খাওয়া :- স্টেশন থেকে বেরিয়ে তিনমাথার মোড়ে থাকা-খাওয়ার প্রচুর হোটেল রেস্টুরেন্ট আছে। ডিসেম্বর-জানুয়ারী মরশুমে ভাটিন্ডা ফলসের কাছে অনেক অস্থায়ী খাবারের দোকান গড়ে ওঠে। অন্য সময়ে কিছুই পাওয়া যাবে না। তাই অফ সিজিনে গেলে কিছু শুকনো খাবার ও জল সঙ্গে নিয়ে যাবেন। ধানবাদে খুব ভালো ভালো মিস্টি পাওয়া যায় অবশ্যই খেয়ে দেখবেন।সঙ্গে রুকস্যাক -১  পার্থ দে 6

আশেপাশে কি কি দেখবেন :- শক্তি মন্দির, ধানসার মন্দির, খন্ডরাস মন্দির, বীরসা মুন্ডা পার্ক, লিলরী ধাম মন্দির, কাতরাস প্যালেস, তোপচাঁচি লেক।
সতর্কতা :- ঝর্ণার জলে স্নান করা নিষেধ। ছবি তোলার জন্য পাথরের খাদ বা বিপজ্জনক স্থানে নামবেন না বা অন্যমনস্কভাবে সেলফি তুলবেন না।
ঘুরতে গিয়ে যেখানে সেখানে আবর্জনা ফেলে আসবেন না।
————————————-
ছবি-লেখক   

প্রচ্ছদ-জয়ন্ত বর্মন