চটি পুলিশ! মুখ্যমন্ত্রীর নতুন আবিষ্কার আর নন্দীগ্রামে মিডিয়া হুল্লোড়

927
চটি পুলিশ! মুখ্যমন্ত্রীর নতুন আবিষ্কার আর নন্দীগ্রামে মিডিয়া হুল্লোড় 1

চটি পুলিশ! মুখ্যমন্ত্রীর নতুন আবিষ্কার আর নন্দীগ্রামে মিডিয়া হুল্লোড় 2 নিত্য গুপ্ত: নন্দীগ্রাম কান্ড নিয়ে মমতা ব্যানার্জী এবং শুভেন্দু অধিকারীরা সিবিআই তদন্ত চেয়েছিলেন। হাইকোর্ট সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন, মনে আছে? আদালতের সেই রায় শোনার পর তৃনমূল, বিজেপি, কংগ্রেস আরও সব রাজনৈতিক দল যারা নন্দীগ্রামে ভূমিউচ্ছেদ প্রতিরোধ বাহিনীর ব্যানারে আন্দোলন করছিল খুশিতে ফেটে পড়েছিল, মনে আছে নিশ্চয়? তারপর সিবিআই রিপোর্ট বেরিয়েছিল সেটা সবাই জানেন কী? যদি না জেনে থাকেন তবে অন-লাইনে সেই রিপোর্ট পড়ে নিতে পারেন। সিবিআই পরিষ্কার ভাবে জানিয়ে দিয়েছে ১৪ই মার্চ নন্দীগ্রামে গুলি চালনার ঘটনায় দায় ছিল ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটিরই। পুলিশ যাতে গুলি চালায় সেই পরিস্থিতি তৈরি করেছিল ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির লোকেরাই। কারন এই ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির ‘আসল’ নেতৃত্বে থাকা মাওবাদীরা আরও কিছু লাশ চেয়েছিল ‘নন্দীগ্রাম আন্দোলন’কে চালিয়ে যেতে। ঠিক লালগড়ে যেমন লাশের পর লাশ ফেলে কিষানজী চেয়েছিলেন ক্ষমতায় আসবেন মমতা ব্যানার্জী আর যুবরাজ হবেন শুভেন্দু অধিকারী।

২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেই বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্য ঘোষণা করেছিলেন, নন্দীগ্রামে ক্যামিকেল হাব প্রকল্প বাতিল করল রাজ্য সরকার। মুখে বলে নয়, লিখিত ঘোষণা। প্রকল্প বাতিল মানেই তো জমি নেওয়ার প্রশ্ন নেই, তাহলে জমি আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া কেন? কেনই বা ১৪ই মার্চের ঘটনা ঘটল? স্রেফ নন্দীগ্রামে দখলদারি বজায় রাখার জন্য। আর এই দখলদারির রাজনীতিতে লাশের প্রয়োজন ছিল। ১৪ই মার্চের আগেই টুকটাক করে লাশ পড়ছিল। সে লাশের বেশিরভাগই কারা ফেলেছে সেটা নন্দীগ্রামবাসী জানে। একটা খালের ওপারে যারা, এপারেও তারা। লড়াই লড়াই খেলা হয়েছে আর লাশ পড়েছে যা চালানো হয়েছে সিপিএমের নামে। বোমা বাঁধতে গিয়ে লাশ পড়েছে চালানো হয়েছে সিপিএমের নামে।

চটি পুলিশ! মুখ্যমন্ত্রীর নতুন আবিষ্কার আর নন্দীগ্রামে মিডিয়া হুল্লোড় 3

অথচ ঘটনা হচ্ছে জানুয়ারি মাসের ৩ তারিখ থেকে নন্দীগ্রামে মাওবাদীদের পরিকল্পনা মত সিপিএম খেদাও অভিযান শুরু হয়ে গেছিল। সিপিএম সমর্থকদের ঘরবাড়ি ভাঙচুর, শঙ্কর সামন্তের হত্যা, মহীতোষ করনের লাশ গায়েব হয়ে যাওয়া! তখন নন্দীগ্রামে সিপিএম কোথায়? সিপিএম সমর্থকদের ছোট শিশু অবধি ভাঙাবেড়া আর বটতলার আশ্রয় শিবিরে। নন্দীগ্রামে ঢোকার সমস্ত রাস্তাই কাটা। তাহলেও নন্দীগ্রামের ভেতরে লাশ পড়ছিল কী করে? তৃনমূলের মুক্তাঞ্চলে ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির নেতা নিশিকান্ত মন্ডলকে খুন করে গেল কারা? তৃনমূলও জানে ওই খুনটা মাওবাদীরা করেছিল কারন নিশিকান্ত মন্ডলের কাছে মাওবাদীরা যে স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্রটি মজুত রেখেছিল সে তা ফেরত দিতে চায়নি এবং মাওবাদীরা নিশিকান্ত মন্ডলকে খুনের পর বুঝতে পারে যে এতে নিশিকান্ত মন্ডলের দোষ ছিলনা তিনি তাঁর ভূমিপুত্র নেতার নির্দেশ পালন করেছিলেন মাত্র।

তাহলে কী সিপিএমের এখানে সশস্ত্র বাহিনী ছিলনা? অবশ্যই ছিল কিন্তু সিপিএমের আগেই সশস্ত্র বাহিনী তৈরি করেছিল মাওবাদী এবং তৃণমূলী হার্মাদ বাহিনী যারা নন্দীগ্রামের ভেতরে সন্ত্রাস চালিয়েছে, খুন করেছে, ঘরবাড়িতে আগুন লাগিয়েছে এবং নন্দীগ্রাম থেকে সিপিএমের ক্ষুদ্রতম সমর্থকদের বের করে দিয়েছে, ঘরছাড়া করেছে। ঠিক একই কায়দায় পরবর্তী কালে যা লালগড়ে তথা জঙ্গলমহল জুড়ে করা হয়েছিল। এই নির্বিচার লুট, অগ্নিসংযোগ, খুন ইত্যাদি সন্ত্রাসে ওই যৌথবাহিনীর সহায়কশক্তি হয়েছিল, শহর থেকে আসা নকশাল, দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে জড়ো হওয়া সমাজসেবী, স্বঘোষিত বুদ্ধিজীবী এবং অবশ্যই মিডিয়া। যে মিডিয়া তার ‘আঁখো দেখা হালে’র  ট্রায়ালে ‘সব সিপিএমের দোষ’ বলে দেখিয়েছিল। কবীর সুমন একবার বলেছিলেন, তাঁর এক মিডিয়া বন্ধু তাঁকে বলেছিলেন কিভাবে রাত্রে একই পক্ষ দুপক্ষ সেজে নন্দীগ্রামের ভেতরে গুলি-বন্দুকের নকল লড়াই লড়ত আর মানুষকে সন্ত্রস্ত করত সিপিএমের হার্মাদ ঢুকে পড়েছে বলে। নন্দীগ্রাম আন্দোলনের প্রথম দিকের নেতা সবুজ প্রধান বলেছিলেন, নন্দীগ্রামের শহিদ মিনারে নাম লেখা আছে এমন শহিদও আছেন যাঁর মৃত্যু হয়েছিল ওই নকল লড়াইয়ে। সবুজ তখন কংগ্রেস করতেন।

সিপিএমের সশস্ত্র বাহিনী ছিল নন্দীগ্রামের বাইরে, খেজুরি সীমান্তে যাঁদের মূলত কাজ ছিল নন্দীগ্রামের মাওবাদী-তৃনমূল হার্মাদরা যাতে খেজুরি দখল করতে না পারে। খেজুরিতে নন্দীগ্রামের যে সিপিএম শরণার্থীরা ছিল তাঁদের ওপর যেন আক্রমন না হয়। সীমান্তে এই দুই হার্মাদদলের মধ্যে লড়াই হয়েছে দু’পক্ষের বডি পড়েছে। এই নন্দীগ্রাম থেকেই তৃনমূল ও মাওবাদীদের বোঝাপড়াটা ভাল হয়। যা পরবর্তীকালে লালগড়ে কাজে লেগেছে।

খুব পরিষ্কার কথা হল নন্দীগ্রামের মানুষের জমি বাঁচানো কারুরই উদ্দেশ্যে ছিলনা। একটা বড়সড় শিকার করার পর যেমন সিংহ থেকে ফেউ অবধি তার ভাগ পেতে উন্মুখ হয়ে থাকে এখানে তেমনই সবাই লড়াইয়ের হিস্যা পেতে ভাগিদারী হয়েছে। কারন নন্দীগ্রামের সেই জমি কেড়ে নিয়েছে ভেড়ি ওয়ালাদের দল। জমির বদলে এখন শুধু মাইলের পর মাইল ভেড়ি। যে নন্দীগ্রামে শিল্প হলে হাজার হাজার যুব কাজ পেতে পারত তাঁদের ঠিকানা এখন ভিন রাজ্য। মাইলে মাইলের পর ভেড়ি, জমির চরিত্র পরিবর্তনের বিরুদ্ধে কোনও কৃষি জমি রক্ষা কমিটি তৈরি হয়নি। এখন নন্দীগ্রামে বুদ্ধিজীবী, লেখক, সমাজসেবীরা আসেনা কারন তাঁরা কলকাতায় বসেই উচ্ছিষ্টর ভাগ পেয়ে যাচ্ছেন। যদি পারেন একবার গিয়ে দেখে আসতে পারেন মমতা ব্যানার্জীর নির্বাচনী এজেন্ট শেখ সুফিয়ানের জাহাজের মত প্রাসাদটা। ১৪ বছর আগের সেই জমি রক্ষার আন্দোলনের নেতা কেমন কামাই করেছেন! কই, এসব তো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেননা? আজ সেই দুজনই নন্দীগ্রামে পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী যাঁরা সমানভাবেই নন্দীগ্রামের সর্বনাশের জন্য দায়ী। এখন এ ওঁর ওপর দোষ চাপাচ্ছেন। সিঙ্গুর, শালবনীর মতই সর্বনাশের আরেক নাম নন্দীগ্রাম যার পেছনে এই দুজনই দায়ী এটা গুবলেট করে দেওয়ার চেষ্টা করছে মিডিয়া।

এখন নন্দীগ্রামে মাটি কামড়ে পড়ে রয়েছে মিডিয়া ! একেবারে ঘরবাড়ি বানিয়ে ফেলেছে দিল্লি,মুম্বাই আর কলকাত্তাওয়ালা মিডিয়া! ক’দিন আগেই নন্দীগ্রামের ওপর দিয়ে বয়ে গিয়েছে আমফান। সর্বনাশ করে দিয়েছে হাজার হাজার পরিবারের। এখনও বাড়ির চাল দাঁড় করাতে না পেরে ভাঙা দেওয়ালের ওপর তারপোলিন টাঙিয়ে রয়েছে মানুষ, ত্রাণের টাকা লুট করেছে পঞ্চায়েত, নেতা। হাতে নাতে ধরা পড়েছে চোর, মানুষের দুর্ভোগ আর যন্ত্রণার উপশম হয়নি তাতে কিন্তু মিডিয়া এখন সে সব দেখাচ্ছেনা। কারন ওই ত্রাণের চোরের দল, চাল চোরের দল আর ত্রিপল চোরের দল এখন দু’দলেই ফিফটি ফিফটি। ঠিক যেমনটা ফিফটি ফিফটি হয়ে গেছে সারদা আর নারদার দল। মিডিয়াকে আনা হয়েছে এই দুই চোরের একজনকে জেতানোর জন্য, যেন চোরের রাজত্বটা বজায় থাকে। চোরের বাইরে গিয়ে কেউ না আবার জিতে যায়! তাহলে নন্দীগ্রামে চুরির রাজত্বটা বহাল রাখা যাবেনা।

১৪ বছর আগেও এরকমই ভাবেই প্রথম দিকে কয়েকটাটা মিডিয়া নন্দীগ্রামকে ঘর বাড়ি বানিয়েছিল। নন্দীগ্রামের কাটা রাস্তা পেরিয়ে শুধু তাদেরই ঢুকতে দিত তথাকথিত জমি আন্দোলনের নেতারা। তারাই ভিডিও শ্যুট করে, গল্প বানিয়ে, লোক সাজিয়ে বাকি মিডিয়ার সামনে হাজির করত নন্দীগ্রাম থানার সামনে। এটা ততদিন চলেছে যতদিন না নন্দীগ্রাম থেকে পুরোপুরি সিপিএম না সরে গেছিল। সিপিএম সরে যাওয়ার পর বাকি জনতার পিঠে মাওবাদী আর তৃনমূলের যৌথবাহিনীর বন্দুক ঠেকানো। তারা তেমনটাই বলেছেন যেমনটা শেখানো হয়েছে। ঠিক যেমনটা লালগড়ে হয়েছিল। এরপর যখন নন্দীগ্রামে সত্যি বলার লোক নেই তখন নন্দীগ্রাম ওপেন টু অল করা হয়েছে। তাও যাদবপুরি নকশালরা কোথাও কোথাও বসে থাকত। আইকার্ড দেখত।

মজার ব্যাপার ১৪ মার্চ ২০০৭, মিডিয়াকে বগলে নিয়েই পুলিশ ভাঙাবেড়া আর অধিকারী পাড়া দিয়ে নন্দীগ্রামে ঢুকতে চেয়েছিল কাটা রাস্তা মেরামত করতে। সঙ্গে কয়েক লরি ভর্তি ইটের টুকরো নিয়ে গিয়েছিল কাটা রাস্তায় ফেলার জন্য। মিডিয়া বলেছে কোনোও দিন একথা? মিডিয়া বলেছে পুলিশ নন্দীগ্রামের দখল নিতে গেছিল ঠিক যেমনটা তৃনমূল মাওবাদীরা বলেছিল। নিহত ১৪জনের ১জনের নাম আজও জানা যায়নি কে সে? মাওবাদীরা, তৃনমূলের লোকেরা ওই যোদ্ধাকে কোথা থেকে এনেছিল? নন্দীগ্রামের মানুষ হলে তার পরিচয় জানা যেত তাইনা? ১৪জনই গুলিতে মারা যায়নি, একাধিক ব্যক্তির শরীরের ছুরিরও আঘাত ছিল। পুলিশ গুলি ছুঁড়েছিল ১০০মিটার দূর থেকে কিন্তু ওই ব্যক্তিদের কারা কাছে থেকে ছুরি মেরে লাশের সংখ্যা বাড়াতে চেয়েছিল? মিডিয়া জানত এসব কথা? বলেছে কোনও দিন?

এরপর সিবিআই তদন্ত। ২০০৭ সালে শুরু হওয়া তদন্তের সম্পুর্ন চার্জশিট সিবিআই দিল ২০১৭ সালে! ১০ বছর! ৩৭ জনের নামে চার্জশিট তারমধ্যে ৩জন পুলিশ আধিকারিক। কেন এত দেরি হল? সিবিআই কর্তারা জানিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার চূড়ান্ত অসহযোগিতা করেছে তদন্তে। কারনটা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় কারন ওই অভিযুক্ত পুলিশ আধিকারিকদের একজন তো এখন তৃনমূলের নেতা! মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন চটি পরা পুলিশ পাঠিয়েছিল বাপ-ব্যাটা। আর বুট পরা পুলিশ আধিকারিক কী করে তাঁর দলে ঢুকে গেলেন? সবই কিন্তু ইধার আর উধারের খেলা। মানুষ যেন সে সব বুঝতে না পারে তাই মিডিয়া সব গুলিয়ে দিচ্ছে।

দিদি আর দাদার ১০বছরের শাসনে নন্দীগ্রামে হাজার হাজার বেকার কেন? নন্দীগ্রামে যাদের চিটফান্ডের টাকা লুট হল তাঁদের টাকা ফেরৎ হওয়ার কথা ছিল? কৃষি জমি ভেড়ি কেন খেয়ে নিল, জেলিংহামে শিল্প হওয়ার কথা ছিল, কোটি কোটি টাকার গাছ কারা কেটে চুরি করে নিল, আবাস যোজনার টাকা, নির্মল মিশনের টাকা কারা কারা কাটমানি খেল? দেখলে দেখা যাবে দু’কুলে তারাই আর মিডিয়া গান গাইছে, এই কুলে আমি আর ওই কুলে তুমি।! মিডিয়ায় এখন শুধু চটি, পায়ের ব্যান্ডেজ, হেলিকপ্টারের ধুলো যাতে নন্দীগ্রাম এসবেরই তলায় চাপা পড়ে থাকে। মিডিয়ায় এখন শুধু বাখানবাজি। এর বাখান আর ওর বাখান। মিডিয়ায় আর কেউ নেই! কারন মিডিয়া এখন চতুর্থ স্তম্ভের বদলে শাসকের বৈতরণী পারের লাঠি হয়ে গেছে। ছবি-নেট দুনিয়া থেকে নেওয়া